ভারতের পররাষ্ট্রসচিব ভিক্রাম মিস্ত্রীর আজ নেপালে থাকার কথা ছিল। ১১-১২ মে, এই দুদিন তাঁর কাঠমাণ্ডু ভ্রমণের তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু নেপালি সংবাদমাধ্যমের খবর, এই সফর স্থগিত করা হয়েছে।
কেন স্থগিত করা হয়েছে, তা নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ।
ভিক্রাম মিস্ত্রীর এই সফরে নেপালের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ-র সঙ্গে দেখা করে তাঁর হাতে ভারত সফরের আমন্ত্রণপত্র তুলে দেওয়ার কথা ছিল। ভারতের দিক থেকে প্রত্যাশা ছিল, এই সফরের মাধ্যমে নেপালের নতুন সরকারের মনোভাব বোঝার ও ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার পথ তৈরি হবে।
কিন্তু হঠাৎ করে কেন এই সফর স্থগিত হয়েছে? ভারতের দিক থেকে আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে, ভিক্রাম মিস্ত্রীর ‘দাপ্তরিক অন্য কিছু কাজ’ চলে আসায় সফর পেছাতে হয়েছে। তবে নেপালি সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া খবর জানিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যম নিউজএইটিন লিখেছে, নেপাল প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ-ই ভিক্রাম মিস্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি। বালেন্দ্র শাহ-র সোজা হিসাব, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে সেটা ‘পদমর্যাদায় সমান’ কেউই হতে হবে।
সানডে গার্ডিয়ান লাইভ জানাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী কিংবা অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কেউ হলে সাক্ষাৎ করবেন বালেন্দ্র শাহ। ভারতের প্রশাসনিক পর্যায়ের একজন সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পক্ষে নন তিনি। নিউজ এইটিন তাদের প্রতিবেদনে নেপাল প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া খবর জানিয়ে লিখেছে, বালেন্দ্র শাহ’র এই ‘বেছে বেছে সাক্ষাত দেওয়ার’ নীতি শুধু ভারতের ক্ষেত্রেই নয়, এর আগে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তিনি দেখা করেননি।
সাধারণত পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের কেউ অন্য দেশে গিয়ে তাঁর সমমর্যাদার কর্মকর্তার সঙ্গেই সাক্ষাৎ করার কথা। তবে আফ্রিকা-এশিয়াভিত্তিক থিংকট্যাংক ইউরেশিয়া রিভিউ জানাচ্ছে, ভারত তার প্রতিবেশি দেশগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত চীন ও পাকিস্তানের বাইরে অন্য দেশগুলোতে কূটনৈতিক এই প্রটোকল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মানতে চায় না। সেদিক থেকে দেখলে নেপালে বালেন্দ্র শাহ-র নতুন সরকার তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে ভিক্রাম মিস্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের এই নেপাল সফর পেছানোর ঘটনা শুধু বালেন্দ্র শাহ-র স্পষ্ট নীতি কিংবা কূটনৈতিক প্রটোকল মানা-না মানার ভিত্তিতেই দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক ইতিহাস এই ঘটনাকে অন্যভাবেও দেখতে বাধ্য করে। এই সফর পেছানোর ঘটনা এমন সময়ে ঘটেছে, যখন ভারত ও নেপালের মধ্যে বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চল লিপুলেখ পাস ব্যবহার করে ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের ২০২৬ কৈলাশ মনসরোবর যাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা চলছে।
লিপুলেখ ও কালাপানি সীমান্ত নিয়ে ভারত, নেপাল ও চীনের টানাপোড়েন অনেক পুরোনো। নেপালের দাবি, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল তাদের সীমানায় পড়েছে। ভারত এই অঞ্চলে অনেক বছর ধরেই প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
এর মধ্যেই ২০২৬ কৈলাশ মনসরোবর যাত্রা নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, দুটি রুট দিয়ে এবারের কৈলাশ তীর্থযাত্রা হবে – একটি সিকিমের নাথু লা দিয়ে, অন্যটি উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস দিয়ে। লিপুলেখ পাসের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটা চীনের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হচ্ছে বলে জানায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
নেপাল তখনই এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে ভারত ও চীনের এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো অধিকার নেই বলে জানিয়ে দেয়। লিপুলেখ অঞ্চল তাদের সীমানার ভেতর জানিয়ে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের সঙ্গে তীর্থযাত্রার রুট নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, তাদের জানানোও হয়নি।
নেপাল অনেক বছর ধরেই হিমালয়ে এই বিতর্কিত ‘তেমুহনী’ অঞ্চল নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।
লিপুলেখ বিতর্ক
ভারত, চীন ও নেপালের সীমান্ত ঘেঁষা লিপুলেখ পাস ভারত ও তিব্বতের মধ্যে বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি রুট। এই অঞ্চল কার সীমানার ভেতর, তা নিয়ে বিতর্ক মূলত ভারত আর নেপালের মধ্যে। মূলত কালী নদীর উৎসমুখের আশপাশের অঞ্চল নিয়েই বিতর্ক। অ্যাঙলো-নেপাল যুদ্ধের পর ১৮১৬ সালের সুগাউলি চুক্তি অনুযায়ী এই অঞ্চলটি নেপালের পশ্চিম সীমান্তের ভেতরে পড়েছে।
নেপালের দাবি, নদীটির উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরাতে, তার মানে কালাপানি আর লিপুলেখ বৈধভাবে নেপালের অংশ। কিন্তু ভারতের দাবি, নদীটির উৎপত্তি আসলে আরও পূর্বে লিপুখোলায় – যা ভারতের সীমানার মধ্যে।
ভারত-চীন সীমান্তের খুব কাছে বলে এই অঞ্চল ভূরাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬২ সিনো-ইন্ডিয়া যুদ্ধের পর থেকে ভারত কালাপানি অঞ্চলে মিলিটারি পোস্ট বসিয়েছে, যাতে হিমালয় অঞ্চলে চীনের অবস্থান ও কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে পারে। এরপর যত সময় গড়িয়েছে, ভারত ততই এই অঞ্চলে প্রশাসনিক ও সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এর উল্টো দিকে নেপাল এই অঞ্চলের ওপর ঐতিহাসিক বিচারে তাদের মালিকানার দাবি জানিয়ে গেছে।
২০২০ সালে ভারত যখন ধারচুলা থেকে লিপুলেখ পাস পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার সড়ক তৈরি করে, অঞ্চলটির মালিকানা নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। ভারত তখন দাবি করেছে, কৈলাশ মনসরোবরে তীর্থযাত্রীদের যাত্রা সহজ করা এবং তাদের সীমান্তের সঙ্গে যোগাযোগ মসৃণ করার উদ্দেশ্যে এই সড়কটি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু নেপাল এর বিরোধিতা করে।
সে সময়ের নেপালি প্রধানমন্ত্রী কে.পি.শর্মা ওলি ভারতের বিরুদ্ধে নেপালি সীমান্তের ভেতরে ঢুকে পড়ার অভিযোগ আনেন, কূটনৈতিক নিন্দাপ্রস্তাবও আনেন।
এর অল্প সময় পরই নেপাল তাদের মানচিত্রের একটি নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে যেখানে লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখকে নেপালের সীমানার ভেতর দেখানো হয়। ২০২০ সালের জুনে নেপালের সংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই মানচিত্র অনুমোদন করে। ফলে অঞ্চলটি নিয়ে বিরোধ নেপালে একটি সাংবিধানিক ও জাতীয়তাবাদী ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় – নেপালের রাজনীতিতেও এরপর থেকে অন্যতম প্রধান ইস্যু এটি।
ভারত নেপালের নতুন ওই ম্যাপকে ‘একতরফা সিদ্ধান্ত’ জানিয়ে পাল্টা জবাবে বলেছে, তাদের সড়ক তৈরির সব কার্যক্রম তাদের নিজেদের সীমানার ভেতরই হয়েছে।
এখানে চীনের ভূমিকা কী?
ভারত ও নেপালের মধ্যে এই অঞ্চল নিয়ে বিরোধ জটিল হয়ে উঠেছে তৃতীয় দেশ হিসেবে চীনও এতে সংযুক্ত থাকায়। ২০১৫ সালেই ভারত ও চীন লিপুলেখকে বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার রুট হিসেবে ব্যবহার করতে সম্মত হয়, এবং সেটা তারা করেছে নেপালের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই! নেপাল তখনো এর বিরোধিতা করেছে।
২০২৫ সালের আগস্টে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র ভারত সফরে আবার চীন ও ভারত একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবারও নেপালের সঙ্গে কোনো আলাপ না করেই! এর কিছুদিন পর (৩১ আগস্ট-১ সেপ্টেম্বর) সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশ সামিটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলাপে এ নিয়ে কথা বলেন নেপালের সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী কে.পি.শর্মা ওলি। সে সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালের এই আঞ্চলিক মালিকানার ব্যাপারে সরাসরি কোনো অবস্থায় তখন নেয়নি চীন, বরং নেপাল ও ভারতের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান হতে পারে বলে পরামর্শ দেয়।
এখন কী হবে
নিউজ এইটিন জানাচ্ছে, মরিশাসে সম্প্রতি নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্করের বৈঠকেই ভারতের পররাষ্ট্রসচিব ভিক্রাম মিস্ত্রীর এই নেপাল সফর নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এই সফরে ভিক্রাম মিস্ত্রী নেপালের প্রধানমন্ত্রীর হাতে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণমন্ত্র তুলে দেওয়ার পরিকল্পনাও হয় জয়শঙ্কর-খানালের মরিশাস বৈঠকে।
কিন্তু এখন ভিক্রাম মিস্ত্রীর নেপাল সফর স্থগিত হয়ে যাওয়ার মানে কি দুই দেশের সম্পর্কে অবনমন? কূটনৈতিক সূত্রের কথা জানিয়ে নিউজ এইটিন লিখেছে, ভারত এটিকে সম্পর্কে ভাঙন হিসেবে দেখছে না, বরং নেপালে নতুন নেতৃত্বের অধীনে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অংশই মনে করে একে।
ভারত ও নেপালের মধ্যে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনাসহ প্রায় তিন ডজন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্র আছে জানিয়ে নিউজ এইটিন লিখেছে, নয়াদিল্লি ভারত-নেপাল সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচকই আছে, কাঠমান্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ বহাল রাখছে। নেপালে ভারতের অর্থায়নে চলতে থাকা প্রকল্পগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করছে ভারত, আরও নতুন কোন ক্ষেত্রে এমন সমন্বয় বাড়ানো যায় তা নিয়েও ভাবছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ-র কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সফরের আমন্ত্রণও ভারত পাঠিয়েছে। পাশাপাশি নেপালের যেকোনো প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশে প্রথম সফরগুলোর একটি হিসেবে যে ভারতকে রাখেন, সেই ধারা অনুসরণে বালেন্দ্র শাহকে উৎসাহিতও করেছে ভারত।