পাকিস্তানের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেলুচিস্তানের ‘স্বাধীনতা’ ঘোষণার খবর। গত বুধবার নিজেকে বেলুচিস্তানের প্রতিনিধি দাবি করে মীর ইয়ার বালুচ নামের এক ব্যক্তি নিজের এক্স হ্যান্ডলে দাবি করেন, পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে।
ওই পোস্টে দাবি করা হয়, রিপাবলিক অফ বেলুচিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনী ইতিমধ্যে বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এমনকি জাতীয় সংগীত ‘মা চুকাইন বালুচানি’ ও জাতীয় পতাকা গ্রহণ করেছে এবং ‘বালুচি ফালুস’ নামে নিজস্ব মুদ্রার প্রচলনও শুরু করেছে।
পোস্টে বেলুচিস্তানের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আহ্বান জানানো হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফাস্টপোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের নাগরিক, বিশেষ করে গণমাধ্যম, ইউটিউবার ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পোস্টে বলা হয়েছে, তারা যেন বালুচদের পাকিস্তানের মানুষ বলে সম্বোধন না করেন।
পোস্টে আরও দাবি করা হয়, ‘আমরা পাকিস্তানি নই, আমরা বালুচিস্তানি। পাকিস্তানের নিজস্ব মানুষ হলো পাঞ্জাবিরা, যারা কখনো বিমান হামলা, জোরপূর্বক গুম ও গণহত্যার মুখোমুখি হয়নি।’
অবশ্য এই দাবির সত্যতা এখনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা পাকিস্তান সরকার নিশ্চিত করেনি, তবে এটি বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও পাকিস্তানের প্রশাসনের সাথে তাদের লড়াইয়ের বিষয়টিকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই প্রদেশটি দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ। তবে এখানে বাস করে দেশের মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ। ইরান ও তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের সাথে বেলুচিস্তানের সীমান্ত আছে এবং আরব সাগরের বিশাল উপকূলরেখা অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
১৯৪৮ সালে কালাত রাজ্যকে মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে পাকিস্তান বেলুচিস্তানকে নিজেদের অংশ করে নেয়। এরপর থেকেই অঞ্চলটি বিদ্রোহে জর্জরিত। বালুচদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তারা অর্থনৈতিক বঞ্চনা, রাজনৈতিক বর্জন ও সামরিক নিপীড়নের শিকার। সোনা, হীরা, রুপা ও তামার মতো প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এর লভ্যাংশ তারা পায় না।
অসন্তোষের আরেকটি বড় কারণ হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিসি)। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ এই বহু বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প। ওমান উপসাগরের কাছে গদরের গভীর সমুদ্র বন্দরটি এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ভারতের কূটনৈতিক পরীক্ষা কেন?
পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার পর বেলুচিস্তান ভারতের কাছে স্বীকৃতি চেয়েছে। ফাস্টপোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বেলুচিস্তানকে স্বীকৃতি দিলে তা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হবে। এর ফলে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তান ভারতকে আবারও আন্তর্জাতিক মহলে কোণঠাসা করার সুযোগ পাবে। অনেকেই তখন বেলুচিস্তানের সাথে কাশ্মীরের তুলনা টানতে পারে, যা নয়াদিল্লির জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে।
তা ছাড়া, ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর চীন ও ভারতের সম্পর্ক মাত্র কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে বেলুচিস্তানকে সমর্থন দিলে বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক আবারও খারাপ হবে এবং চীন-পাকিস্তান সামরিকভাবে আরও কাছাকাছি চলে আসবে, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। একই সাথে ইরানের সাথে ভারতের চাবাহার বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।



