প্রেমের সুযোগ মিলছে না, দায়িত্ব নিল বৌদ্ধ মন্দির!

পোড়া-কমলা রঙের জোব্বা পরা এক বৌদ্ধ ভিক্ষু দাঁড়িয়ে আছেন একদল তরুণ-তরুণীর সামনে। তাঁদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘আপনারা এখানে এসেছেন দেশকে এক বড় সংকট থেকে বাঁচাতে। একজন সঙ্গী খুঁজে নিন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্ম দিন।’ ভিক্ষুর কথা শুনে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

এটি কোনো রিয়ালিটি শোর দৃশ্য নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার পালগংসান পাহাড়ের সবুজ গাছপালা দিয়ে ঘেরা অষ্টম শতকের ঐতিহাসিক ‘দংহ্বাসা’ বৌদ্ধ মন্দিরে বসেছিল এই ব্যতিক্রমী প্রেমের আসর। তরুণ-তরুণীদের জড়তা ভেঙে এক দিন ও এক রাতের এই নিবিড় আয়োজনের লক্ষ্য একটাই—জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া।

আয়োজক ইয়ু চিওল-জু বলেন, ‘দেশ যখনই সংকটে পড়েছে, বৌদ্ধরা সবসময়ই প্রথম এগিয়ে এসেছে। তবে এবারের সংকট বাইরের কোনো শত্রু নয়; আমাদের দেশের রেকর্ড কম জন্মহার এখন জাতীয় সংকট। তাই আমাদের কিছু একটা করতেই হতো।’

ধনী দেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৩ সালে দেশটির প্রজনন হার রেকর্ড নেমে হয়েছিল ০.৭২, যা ২০২৫ সালে ছিল ০.৮। তবে ২০২৬ সালের বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী এই হার কিছুটা বেড়ে ১.০-এ পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আকাশচুম্বী আবাসন খরচ, শিশু পালনের আর্থিক অনটন এবং নারীদের ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দেওয়াকে এর কারণ মনে করা হয়। তবে গবেষণা বলছে, তরুণদের ডেটিং বা মেলামেশার সুযোগও কমে গেছে।

এই সংকট কাটাতে কোরিয়ান সরকার দীর্ঘ পিতৃত্বকালীন ছুটি, নগদ অর্থ ও নবদম্পতিদের জন্য সুলভ আবাসন দিচ্ছে। আর স্থানীয় সরকার ও নাগরিক সংগঠনগুলো এক ধাপ এগিয়ে মন্দিরে এই ‘ম্যাচমেকিং’ বা ঘটকালির আয়োজন করছে। এই আয়োজনে অংশ নিতে দেড় হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছিল, যেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে মাত্র কয়েকজনকে বেছে নেওয়া হয়।

এখানে অংশ নেওয়া ২৮ বছর বয়সী সানহ্যেজি বলেন, ‘চাকরির কারণে সিউল ছাড়ার পর একা হয়ে পড়েছি। অফিস আর বাসা ছাড়া কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। পুরুষদের সঙ্গে চেনা-জানার কোনো সুযোগই পাচ্ছিলাম না।’ একই অবস্থা ৩০ বছর বয়সী কোয়ন সেউং-ওহর। তাঁর দুগ্ধ কারখানার ৯৭ শতাংশ কর্মীই পুরুষ। বন্ধুদের সুবাদে কিছু ব্লাইন্ড ডেট করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি।

মন্দিরে পৌঁছানোর পর তরুণীদের ব্যাগ বহন করতে এগিয়ে আসেন তরুণরা। এরপর শুরু হয় আলাপ-পরিচয়, গোলাপ দেওয়া-নেওয়া, একসঙ্গে দুপুরের খাবার এবং বাসন ধোয়ার পর্ব। জমে ওঠে আড্ডা। তবে সবচেয়ে মজার মুহূর্তটি আসে যখন শুরু হয় ‘ট্যালেন্ট শো’। কেউ কে-পপ গানের সঙ্গে নাচলেন, কেউ গাইলেন আবেগঘন গান, আবার কেউ দেখালেন স্প্যানিশ ভাষার দক্ষতা।

এরপর শুরু হয় ‘স্পিড-ডেটিং’ পর্ব। ডিনারের সময় সানহ্যেজি তাঁর পছন্দের গোলাপ দেন মিনহো নামের এক সরকারি চাকরিজীবীকে। রাতের শেষে প্রধান ভিক্ষু দেশাত্মবোধক গান গেয়ে সবাইকে সন্তান জন্মদানের জাতীয় দায়িত্ব মনে করিয়ে দেন। তবে সিঙ্গেলদের মনোযোগ তখন দেশপ্রেমের চেয়ে রোমান্টিক ভাগ্যের দিকেই বেশি ছিল।

২০০৬ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার জন্মহার বাড়াতে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। ২০২৪ সাল থেকে দেশটির জন্মহার ও বিয়ের প্রতি তরুণদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা বাড়তির দিকে। মন্দিরে আসা তরুণীরাও জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের বিয়ে ও সন্তান হওয়ার খবর দেখে তাঁদের চিন্তাভাবনাও ইতিবাচক হচ্ছে।

পরদিন সকালে খুদে বার্তার মাধ্যমে সবাই আয়োজকদের কাছে তাঁদের চূড়ান্ত পছন্দের মানুষের নাম পাঠান। ৩০ ঘণ্টার এই আয়োজন শেষে আটটি নতুন জুটি বা কাপল তৈরি হয়। যাঁরা সঙ্গী পাননি, তাঁরাও হতাশ নন। কেউ কেউ ফিরেছেন একঝাঁক নতুন বন্ধু নিয়ে, কেউ আবার পেয়েছেন নিজের ওপর নতুন আত্মবিশ্বাস। সঙ্গী না মিললেও নতুন বন্ধু ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে হাসিমুখে মন্দির ছাড়েন তরুণ-তরুণীরা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি