ট্রাম্প ও পুতিন – দুজনের বন্ধুত্বও তাঁর পতন ঠেকাতে পারছে না?

হাঙ্গেরিতে আজ রোববার জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ চলছে। এই নির্বাচন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবান-এর ১৬ বছরের ক্ষমতা ধরে রাখার সমাপ্তি টেনে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেটা হলে তা ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার জন্য বড় একটা ধাক্কা হবে। পাশাপাশি অরবানের পতন পশ্চিমের ডানপন্থী রাজনৈতিক মহলেও প্রভাব ফেলতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয়ও।

অরবান একজন ইউরোপবিরোধী জাতীয়তাবাদী নেতা। তিনি এমন এক ‘অ-উদার গণতন্ত্রে’র মডেল গড়ে তুলেছেন, যে মডেলকে অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) আন্দোলন। ইউরোপেও অনেক দেশে অরবানের এই মডেলের সমর্থক আছে।

তবে গত কয়েক বছরে অনেক হাঙ্গেরিয়ান অরবানের ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছেন, অন্তত নির্বাচনের আগের জরিপের ফল তা-ই বলছে। ৬২ বছর বয়সী অরবানের বিরুদ্ধে জনগণের একটা অংশের ক্ষোভের কারণ – একদিকে টানা তিন বছরের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ ধুঁকছে, অন্যদিকে এর মধ্যেই সরকারের ঘনিষ্ঠ ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ এন্তার।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার মাগিয়ার-এর নতুন মধ্য-ডানপন্থী বিরোধী দল টিসা পার্টির চেয়ে পিছিয়ে আছে অরবানের ক্ষমতাসীন ফিদেজ পার্টি। টিসা পার্টির সমর্থন ৩৮ থেকে ৪১ শতাংশের মধ্যে, যা ফিদেজের চেয়ে ৭ থেকে ৯ শতাংশ বেশি।

রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি

জরিপ সংস্থাগুলো রেকর্ড ভোটার উপস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছে। স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৪.২৩ শতাংশ, যা ২০২২ সালের নির্বাচনে একই সময়ের (৬২.৯২ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি। টেলিভিশন ফুটেজে দেখা গেছে, বুদাপেস্টের কিছু ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন।

ভোট দেওয়ার পর পিটার মাগিয়ার বলেন, হাঙ্গেরিয়ানরা ইতিহাস লিখবে। তারা এখন ‘পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে’ একটি পথ বেছে নিচ্ছে। তিনি ভোটারদের অনিয়ম দেখলে রিপোর্ট করার আহ্বানও জানান। বলেন, ‘নির্বাচনী জালিয়াতি খুবই গুরুতর অপরাধ।’

মাগিয়ার ভোটের ফল নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসই প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এখানে মূল প্রশ্ন হলো টিসা পার্টি কি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, নাকি ১৯৯ আসনের পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পাবে। হাঙ্গেরির সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনে কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ পেয়ে যাবে।

পিটার মাগিয়ার যে এলাকায় ভোট দিয়েছেন, সেই একই এলাকায় ভোট দিয়েছেন অরবানও। আগের চারটি নির্বাচনে জয়ী অরবান ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাঙ্গেরিতে একটি সংবিধান আছে এবং সেটি মানতে হবে। জনগণের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে হবে।’

পরিবর্তন নাকি ধারাবাহিকতা

বুদাপেস্টে টিসা পার্টির পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী মিহাই বাচি। তিনি বলেন, ‘মানুষের মনে শান্তি ফেরা দরকার। অনেক ক্ষেত্রেই অনেক বেশি উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে, আর বর্তমান সরকারকে দেখে মনে হচ্ছে তারা এসব আরও বাড়িয়েই দিচ্ছে।’

অন্যদিকে ৮৩ বছর বয়সী ইস্তভান স্টোফকা বলেন, তিনি অরবানের পক্ষেই ভোট দিয়েছেন। তাঁর মতে, সমাজকল্যাণ ও পরিবার-নীতিতে অরবানের সরকারই সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে। তিনি বলেন, ‘(হাঙ্গেরি) কমিউনিজম থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করার পর থেকে এটাই (ফিদেজ) একমাত্র দল যারা তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে।’

অরবান প্রচারণার সময় বলেছেন, এই নির্বাচন ‘যুদ্ধ বনাম শান্তি’র মধ্যে একটি নির্বাচন। সরকার দেশজুড়ে প্রচারণা চালিয়ে দাবি করেছে, টিসা পার্টি ক্ষমতায় এলে রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধে হাঙ্গেরিকে জড়িয়ে ফেলবে। যদিও টিসা পার্টি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইউরোপীয় নজরদারি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো এই নির্বাচনের ওপর গভীরভাবে নজর রাখছে। অনেক ইউরোপীয় নেতা অরবানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, অরবান গণতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার খর্ব করেছেন। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে অরবানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ তো আছেই!  

অরবানের পরাজয় হলে ইউরোপে রাশিয়া তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রকে হারাবে। আর ইউক্রেনের জন্য এর অর্থ হতে পারে প্রায় ৯০০০ কোটি ইউরো (প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) ঋণ ছাড় পাওয়া — যা তাদের যুদ্ধ পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই ঋণ ছাড় এতদিন আটকে রেখেছিলেন হাঙ্গেরির নেতা অরবান।

রাশিয়ার সরকার এই নির্বাচনে অরবানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনও অরবানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের ঠিক আগে আগে সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বুদাপেস্ট সফরকেও এই সমর্থনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার কারণে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়েছেন পিটার মাগিয়ার, যিনি একসময় অরবানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বেশি দেখা যাচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ফলাফল এখনো নিশ্চিত নয়। অনেক ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তাছাড়া নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিন্যাস ফিদেজ পার্টির পক্ষে গেছে বলে অভিযোগ আছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত ভোটারদের বড় অংশও সাধারণত ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করে।

যদি টিসা পার্টি জয়ী হয়, তাহলে অরবানের সময়ে গড়ে ওঠা আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তন করা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে — বিশেষ করে যদি তারা শুধু সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।