যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভূমিকা উদ্যাপন করা উচিত ভারতের, কারণ ভারতও শান্তিই চায় — এমন মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা শাশি থারুর। আজ এনডিটিভির ভাসুধা ভেনুগোপালকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে ভারতের প্রতিক্রিয়াকে তিনি ‘পরিণত’ ও ‘যুক্তিসংগত’ বলে উল্লেখ করেন।
ইসলামাবাদের এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নয়াদিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত কি না — এমন প্রশ্নে শাশী থারুর বলেন, ‘কেন (এটা উদ্বেগের কারণ হবে) আমি বুঝতে পারছি না। কারণ সবকিছুই তো জিরো-সাম (এক পক্ষের লাভ মানে অন্য পক্ষের ক্ষতি) খেলায় পড়ে না। যদি এখানে পাকিস্তান ভারতে সন্ত্রাসী পাঠানোর জন্য প্রশংসা পেত, তাহলে সেটা জিরো সাম গেইম হতো। কিন্তু যখন পাকিস্তানিরা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এমন একটা কাজ করছে, যে শান্তি আমরাও দেখতে চাই, আমার তো মনে হয় সেটাকে আমাদের বরং উদ্যাপন করাই উচিত।’
শাশী থারুর আরও বলেন, ‘ভারত সরকারও তাদের বিবৃতিতে শান্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। আমার মনে হয় সেটাই সঠিক, পরিণত ও যুক্তিসংগত অবস্থান। কারণ ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের কৌশলগত সংযম, আঞ্চলিক দায়িত্ববোধ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বর হিসেবে আমাদের ভূমিকা — সব মিলিয়েই আমাদেরকে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।’
কূটনীতিক হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই কংগ্রেস নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের প্রসঙ্গও তোলেন, পরে এডিট করে ফেলা যে পোস্ট থেকে এই ধারণা ছড়িয়ে গেছে যে পোস্টটি আসলে ওয়াশিংটন থেকে লিখে পাঠানো হয়েছে। শাশী থারুর বলেন, ‘সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছে একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ হিসেবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই সরাসরি পিছু হটছে না দেখিয়ে উত্তেজনা কমাতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর মানে এখানে আসল উদ্যোগটা হয়তো পাকিস্তানের নয়, বরং পাকিস্তান এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কূটনৈতিক আড়াল। তাই এটিকে পাকিস্তানের বড় কোনো কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখার দরকার নেই। তবে ইসলামাবাদে এই ভূমিকা পালন করার বিষয়টি সম্মানের সঙ্গে দেখা উচিত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ আসিম মুনিরের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক তো আমরা সবাই দেখেছি।’
শাশী থারুর বলেন, পাকিস্তান ইরানের প্রতিবেশী দেশ, তাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে শরণার্থীর ঢলসহ নানা প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়তে পারে। ‘এখানে পাকিস্তানের স্কিন ইন দ্য গেইম (সরাসরি স্বার্থ) আছে। তাই তারা সংঘাত থামাতে আগ্রহী থাকবে — এটাই স্বাভাবিক’, বলেন তিনি।
পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান থারুর বলেন, বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। ‘আমরা হাত গুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। তবে এটিকে জিরো সাম গেইম হিসেবে দেখারও দরকার নেই। পাকিস্তানের কিছু বিশেষ সুবিধা আছে, তারা সেটা কাজে লাগাচ্ছে - লাগাক। আমাদের উচিত আগ্রহী প্রতিবেশি হিসেবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা, সমালোচক বা বিরূপ মনোভাব নিয়ে নয়। কারণ শান্তি প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা কামনা করার কোনো কারণ আমাদের নেই। আমরা চাই আঞ্চলিক নিরাপত্তা। ইরান যুদ্ধ কমে এলে জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল হবে, তাতে ভারতের স্বার্থও তো সুরক্ষিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের চারপাশে আগুন জ্বলছে, তাই চাইলেও লম্বা সময় ধরে চুপচাপ বসে থাকা ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। একসময় যে উদার আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ধরে রেখেছিল, এখন সেখানে যেন কোনো নিয়মই নেই।’
থারুরের মতে, নতুন উদীয়মান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ভারতকে বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠ হিসেবে উঠে আসতে হবে। ‘এটা শুধু টিকে থাকার বিষয় নয়। আমাদের নিজস্ব প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব বিবেকের স্বার্থে কূটনৈতিক উদ্যোগ দেখাতে হবে। পৃথিবীকে ভেঙে পড়তে দেওয়া যায় না’, বলেন তিনি।
কংগ্রেস এই নেতা সতর্ক করে বলেন, ‘জঙ্গলের আইনের (যার যত শক্তি, যে যত নিষ্ঠুর, সে-ই টিকে থাকবে) মতো পরিস্থিতি কারও জন্যই ভালো নয়। এতে সবাই শক্তিধর পরাশক্তির করুণার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কেউই সেটা হতে চায় না। আমার মনে হয়, যে ধারাটা চলছে, এটার শেষে আমাদের সত্যিকারের বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বর হিসেবে উঠে আসতে হবে। এমন এক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়াতে হবে — যেটা হয়তো ভেঙে পড়া বর্তমান ব্যবস্থার মতো হবে না, বরং তার জায়গায় নতুন কিছু হবে, যা সবার স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।’