পশ্চিমবঙ্গে পশু জবাইয়ের আইন নিয়ে লড়াই গড়াল আদালতে

পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশু জবাই নিয়ে উত্তেজনা তীব্র হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার গরু কোরবানি সংক্রান্ত ১৯৪৯ সালের আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে আসন্ন কোরবানির ঈদে পশু জবাই করা যাবে কি না তা নিয়ে।

এই পরিস্থিতিতে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার মোট ১১টি মামলা শুনানি হয়। এর মধ্যে তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামানও একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার শুনানি দীর্ঘক্ষণ চলে, তবে বৃহস্পতিবার রায়দান সম্পূর্ণ হয়নি এবং স্থগিত রাখা হয়।

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক নির্বাচনে জিতে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেছে বিজেপি। কদিন আগে নতুন মূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার জানিয়ে দেয়, গরু-ছাগল-মহিষসহ কোনো গবাদিপশু প্রকাশ্যে জবাই দেওয়া যাবে না। এছাড়া জবাইয়ের আগে গবাদিপশুর ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়াও বাধ্যতামূলক করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ১৪ বছরের কম বয়সী ও প্রজননে সক্ষম গবাদিপশু জবাই করা যাবে না।

আদালতে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি

মামলাকারী মহম্মদ শাকিল ওয়ারসির আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি ১৯৫০ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। যাদের ইতিমধ্যেই গরু আছে, তাদের জন্য আইন শিথিল করা হোক।’

আইনজীবী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যে সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তা কে দেবে? সেই পরিকাঠামো কোথায়? কসাইখানা কোথায়? কোরবানির জন্য লোক কোথায় যাবে? রাজ্য জানে, এটা করা সম্ভব নয়। সারা দেশেই ১৪ বছরের বেশি বয়সের গরু পাওয়া যাবে কি?’

মামলাকারী মহম্মদ জাফর ইয়াসনি আদালতকে বলেন, ‘সরকার অনুমোদিত জবাইখানার তালিকা প্রকাশ করুক। সাধারণ নাগরিক যাতে কোনো বেআইনি হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা হোক।’

অন্যদিকে প্রাণীহত্যা বন্ধের পক্ষ থেকে রামকৃষ্ণ পাল বলেন, ‘গরু জবাই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হোক। কোরবানির নামে নিরীহ পশু হত্যা বন্ধ করা প্রয়োজন। হিন্দু ধর্মে বলি মানে নিজের পশুসুলভ প্রবৃত্তি দমন করা, পশু হত্যা নয়।’ আইনজীবী দেবযানী দাশগুপ্ত বলেন, ‘ধর্মীয় কারণে কোরবানির সমস্ত রকম কুরবানি বন্ধ করা হোক। পশুর বলি দেওয়া বন্ধ করতে হবে।’

আইনের প্রসঙ্গ

আদালতে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের নতুন বিধানের বিরুদ্ধে যুক্তি এনে বলা হয়, রাজ্য প্রশাসন ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইনের অধীনে ‘ফিটনেস শংসাপত্র’ প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করতে ব্যর্থ। অর্ধশিক্ষিত ও গ্রামীণ মানুষদের কাছে আইন অজানা। বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘পশু জবাইয়ের জন্য ফিটনেস শংসাপত্র প্রয়োজন, কিন্তু এর জন্য বাস্তবিক কাঠামো নেই।’ গরু গড়ে ১৫ বছরের মতো বাঁচে জানিয়ে বলা হয়, সারা দেশে ১৪ বছরের বেশি এত গরু কীভাবে পাওয়া যাবে?

আইন অনুযায়ী শংসাপত্র দেওয়া না হলে ব্যক্তি ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্যের কাছে আপিল করতে পারবে। বিজ্ঞপ্তি ১৩ মে জারি হলেও, ধর্মীয় বা চিকিৎসাজনিত কারণে আইন প্রয়োগে ব্যতিক্রম রয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, ‘যদি এই আইন কার্যকর না থাকত, এতগুলি মামলা দায়ের করার প্রয়োজনই হত না। প্রতি বছর এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সুতরাং আইন কার্যকর রয়েছে।’

রাজ্যের পক্ষে যুক্তি:

রাজ্যের সিনিয়র স্ট্যান্ডিং কাউন্সিল নীলাঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘বিজ্ঞপ্তি হাইকোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতেই দেওয়া হয়েছে। কেউ হাইকোর্টের নির্দেশনা চ্যালেঞ্জ করেনি। রাজ্য শুধু নির্দেশনা পালন করছে।’

কলকাতা পুরসভার আইনজীবী বলেন, ‘বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। ফলে জনগণ জানে, হঠাৎ জারি হয়নি। ৬১০টি ঘটনায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক প্রভাব:

তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান বলেন, ‘কোরবানির ঈদ মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নির্দেশিকার কারণে বহু মানুষ বিপাকে পড়েছেন।’ সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেন, ‘গরু জবাই বন্ধ হলে হিন্দু ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়বেন। গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ধর্মীয় রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ হবে। মোষ বা বলদ কোরবানির অনুমতি দেওয়া হোক।’

এই পরিস্থিতিতে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনও স্থগিত রয়েছে। কোরবানির ঈদে পশু জবাই সংক্রান্ত নির্দেশিকা কার্যকর হবে কি না, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।