পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন নাটকীয় মোড়। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন হেভিওয়েট বিদ্রোহী সংসদ সদস্য (এমপি) এমন একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন, যার অস্তিত্বের কথাই এত দিন কেউ জানত না। ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই) নামের এই অপরিচিত দলটিতে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে ইতিমধ্যেই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়েছেন এই বিদ্রোহীরা।
খাতায়-কলমে দলটির ফেসবুক পেজে এখন দাবি করা হচ্ছে, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ থেকে লোকসভায় সবথেকে বেশি সংসদ সদস্য রয়েছে তাদেরই। রোববার বিদ্রোহীদের যোগদানের পর থেকেই দলটির সমাজমাধ্যমের পেজগুলো হঠাৎ বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জেতা যে ২০ জন সংসদ সদস্য দল ছেড়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মমতা ব্যানার্জীর দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক সহকর্মী ও বারাসাতের এমপি কাকলি ঘোষ দস্তিদার, ২০০৯ সাল থেকে টানা জিতে আসা চলচ্চিত্র তারকা ও বীরভূমের এমপি শতাব্দী রায় এবং উত্তর কলকাতা কেন্দ্রের প্রবীণ সংসদ সদস্য সুদীপ ব্যানার্জী।
তালিকায় আরও আছেন বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা দেব, কলকাতা পৌর সংস্থার চেয়ারপার্সন ও দক্ষিণ কলকাতার এমপি মালা রায়, বোলপুরের অসিত মাল এবং পার্থ ভৌমিক। এমনকি কদিন আগেও নিজেদের মমতা ব্যানার্জীর অন্ধ সমর্থক হিসেবে জাহির করা অভিনেত্রী সায়নী ঘোষ, জুন মালিয়া ও রচনা ব্যানার্জীর পাশাপাশি情 অভিষেক ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত মথুরাপুরের এমপি বাপি হালাদারও এই তালিকায় সই করেছেন।
কারা এই এনসিপিআই?
ভারতের নির্বাচন কমিশনের নথিভুক্ত হলেও রাজনৈতিক মহলে সম্পূর্ণ অচেনা এই দলটির প্রতীক হলো ‘সাত রশ্মি দেওয়া কলমের নিব’। দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ত্রিপুরায় এবং ২০২৩ সালে এটি নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি পায়। কমিশনের নথি অনুযায়ী, দলটির প্রধান কার্যালয় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার সাঁকরাইলের বাণীপুর (হাটগাছা) এলাকায় ‘জাগো বিশ্ব’ নামের একটি ভবনে। সোমবার সকাল থেকেই এই কার্যালয় এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে টহল দিতেও দেখা গেছে।
২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে এই দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তাঁদের প্রাপ্ত ভোট ছিল নামমাত্র। কৈলাশহরে তাদের প্রার্থী জাহাঙ্গির আলি পেয়েছিলেন মাত্র ২৮৬ vote এবং আমবাসায় দলটির প্রার্থীর জামানত জব্দ হয়েছিল।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের নথিতে দলটির সভাপতি হিসেবে যাঁর নাম রয়েছে, সেই শিউলি কুন্ডু নামের এক নারী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, তিনি কিছুদিন আগেই দল থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। এটি মূলত তিনি ও তাঁর স্বামীর দল ছিল। অথচ তাঁর এই হাই প্রোফাইল দলে সদ্য যোগ দেওয়া তৃণমূলের হেভিওয়েট বিদ্রোহীদের কারও সঙ্গেই তাঁর কোনো কথা হয়নি।
কেন এই অজানা দলকে বেছে নিলেন বিদ্রোহীরা?
হঠাৎ কেন এমন একটি দলে যোগ দিলেন সুদীপ বা কাকলিদের মতো পরিচিত নেতারা? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে ভারতের কঠোর ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন’। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সরাসরি দলত্যাগ করলে সংসদ সদস্য পদ খারিজ হওয়ার আইনি জটিলতা তৈরি হতো। সেটি এড়াতেই এনসিপিআই-কে সামনে রেখে খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে লোকসভায় একটি পৃথক ব্লক গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই বিদ্রোহীরা।
বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের অন্যতম শতাব্দী রায় এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই দল বেছে নেওয়ার নেপথ্যে কোনো আলাদা কারণ নেই। এটা সম্পূর্ণ আইনি বিষয়। আমরা এনডিএর শরিক হব বলেই নতুন দলে যোগ দিয়েছি। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল।’
আরেক এমপি অসিত মাল জানান, মানুষের স্বার্থে ও উন্নয়নের স্বার্থেই তাঁরা এই আলাদা ব্লক তৈরি করেছেন।
নেপথ্যে কি তবে বিজেপি?
কাকলি ঘোষ দস্তিদাররা এনডিএ-কে সরাসরি সমর্থনের কথা জানালে তৃণমূলের আরেক সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জী কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘বিজেপি তাদের দলে নেবে না’। বাস্তবে বিজেপি সরাসরি তাদের দলে না নিলেও, এই ভাঙনের নেপথ্যে যে গেরুয়া শিবিরের হাত রয়েছে তা স্পষ্ট।
জানা গেছে, দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের মধ্যস্থতায় একটি বৈঠক আয়োজিত হয়েছিল, যেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। এমনকি এনসিপিআই দলের বর্তমান সভাপতি উত্তীয় কুন্ডুর সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর ছবিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে কুন্ডু নিজেই নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ফলে তৃণমূলের সংসদীয় দলে এই বড় ভাঙন এবং নতুন ব্লক তৈরির মাস্টারপ্ল্যান যে বিজেপির ইশারাতেই হয়েছে, তা বুঝতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।