দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে কি নীরবেই বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য? কোনো যুদ্ধের ঘোষণা নেই, কোনো পারমাণবিক পরীক্ষাও নেই; তবুও একের পর এক এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে ভারত, যা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে সামরিক বিশ্লেষকদের। বছরের পর বছর যে দেশ বলেছে, পারমাণবিক অস্ত্র শুধু প্রতিরক্ষার জন্য—সেই দেশই এখন ধীরে ধীরে বদলে ফেলছে নিজের প্রস্তুতির ধরন। প্রশ্ন উঠছে—ভারত কি শুধু আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, নাকি ভবিষ্যতের বড় কোনো সংঘাতের হিসাব কষছে?
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ‘ইয়ারবুক ২০২৬’-এর তথ্য বলছে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারত তার ১২টি পারমাণবিক ওয়ারহেড ‘অপারেশনালি’ মোতায়েন করেছে। এর আগে ভারতের নীতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। পারমাণবিক ওয়ারহেড এবং ক্ষেপণাস্ত্র আলাদা জায়গায় সংরক্ষণ করা হতো। প্রয়োজন হলে পরে সেগুলো একত্র করা হতো। কিন্তু এবার সেই নীতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা এখন প্রায় ১৯০। এর মধ্যে ১২টি এখন সরাসরি মোতায়েন অবস্থায় রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলোর একটি অংশ পারমাণবিক সাবমেরিনে এবং কিছু ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত পাল্টা আঘাত হানা যায়।
ভারত অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো তাদের আগের নীতিতে অটল থাকার কথাই বলছে। অর্থাৎ, তারা আগে থেকে পারমাণবিক হামলা চালাবে না—শুধু আক্রান্ত হলে পাল্টা জবাব দেবে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নীতি নয়, বাস্তবে কত দ্রুত অস্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সক্ষমতাই এখন বাড়াচ্ছে নয়াদিল্লি।
চীনের হাতে এখন ৬২০টিরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের হাতে রয়েছে আনুমানিক ১৭০টি। দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মাঝখানে অবস্থান করায় ভারতও নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। ভারতের পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে বড় ভরসা এখন তার ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’—অর্থাৎ স্থল, আকাশ এবং সমুদ্র—তিন দিক থেকেই পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা।
তবে এখানেই শেষ নয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতের কিছু কৌশলগত বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে দেশটির ‘আগে হামলা না করার’ নীতিও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। যদিও ভারত সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেয়নি, তবুও বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নয়াদিল্লি বলছে, তাদের এই প্রস্তুতি কেবল প্রতিরোধের জন্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো—দক্ষিণ এশিয়ার তিন পারমাণবিক শক্তিধর দেশের অস্ত্রভাণ্ডার যত আধুনিক হচ্ছে, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা উত্তেজনার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। নীরবে চলা এই পারমাণবিক প্রস্তুতি হয়তো আজই যুদ্ধের ইঙ্গিত নয়, কিন্তু এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।