অনর্গল বোমা হামলার সময় তাঁরা গৃহকর্মীকে ঘরে তালা মেরে চলে যান

আনদাকু (ছদ্মনাম) এখনো ঠিক ধাতস্থ হননি। এখনো সেই আতঙ্ক তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কেনিয়ার মেয়ে আনদাকু লেবাননে এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। এমনিতে গত বেশ কিছুদিন ধরে ইসরায়েলি হামলা তাঁর ও তাঁদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেদিন যা ঘটেছিল, তা ২৪ বছর বয়সী এই তরুণীকে স্থায়ী আতঙ্কের জগতে নিয়ে গেছে। আকাশ থেকে ইসরায়েলি বিমান হামলা চলছে। একের পর এক বোমা ফেলা হচ্ছে। আর তিনি আবিষ্কার করেন তাঁকে ঘরে রেখে তালা মেরে চলে গেছেন তাঁর মালিক।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়, ২৪ বছরের আনদাকু লেবাননে গত ৮ মাস ধরে গৃহকর্মীর কাজ করেন। কিন্তু গত এক মাস তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। কারণ, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সামরিক অভিযান ও বোমা হামলা তীব্র করেছে। ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালাচ্ছে বললেও, আদতে সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।

সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আনদাকু বিবিসি নিউজ অ্যারাবিককে বলেন, ‘সেদিন ভীষণ বোমা হামলা হচ্ছিল। আমাকে ঘরের মধ্যে তালা মেরে আমার নিয়োগকর্তা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান।’

চারপাশ থেকে তখন ভয়াবহ বোমা বিষ্ফোরণের শব্দ। এটা এতটাই যে, আনদাকু বলা যায় এক স্থায়ী আতঙ্কের জগতের প্রবেশ করেন। আনদাকু মনে করতে পারেন না যে, ঠিক কতদিন ওই ঘরে তিনি একা ছিলেন। বোমা হামলা কিছুটা কমে এলে তাঁর নিয়োগকর্তার পরিবার ঘরে ফিরে আসে।

আনদাকু বলেন, ‘ফিরে এসে তারা আমাকে তাড়িয়ে দেয়। তারা এমনকি আমার বেতনও দেয়নি। আমার এখন কোথাও যাবার নেই।’

আনদাকুর ভাষ্যমতে, অন্য অনেকের চেয়ে তাঁর ভাগ্য ভালো। কারণ, বৈরুতে পৌঁছাতে বাস ভাড়া দেওয়ার মতো যথেষ্ট টাকা তাঁর কাছে ছিল। কিন্তু অনেকেরই এমন সামর্থ্য থাকে না।

লেবাননে সবচেয়ে বেশি কর্মী আছে কেনিয়া, ইথিওপিয়া, সুদান, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের। ছবি: রয়টার্সঠিক ধরেছেন, আনদাকু একা নন। লেবাননে বিভিন্ন দেশ থেকে গিয়ে গৃহকর্মীর কাজ করছেন, এমন অনেককেই এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নিয়োগকর্তারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে এতটাই ব্যস্ত যে, অনেক সময় নিজের কর্মীদের নিরাপত্তার কথাটি ভুলে যাচ্ছেন। এতে বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকা এই মানুষেরা পড়ছেন বিপদে।

গত শুক্রবার জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লেবাননে সরকারিভাবে পরিচালিত ৯০০ আশ্রয়কেন্দ্রের সবগুলোই প্রায় পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপাকে আছেন দেশটিতে লাখের বেশি কাজ করা অভিবাসী নারীরা, যারা মূলত গৃহকর্মীর কাজের সাথে যুক্ত। এ বিষয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, লেবাননে বিভিন্ন দেশের প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কর্মী কাজ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী আছে কেনিয়া, ইথিওপিয়া, সুদান, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের। লেবাননে আইওএম কার্যালয়ের প্রধান ম্যাথিউ লুসিয়ানো বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা গৃহকর্মীদের অনিরাপদ স্থানে ফেলে মালিকদের পালিয়ে যাওয়ার তথ্য পাচ্ছি। যত সময় যাচ্ছে এ ধরনের ঘটনা তত বেশি ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৃহকর্মীদের হয় পথে, না হয় ঘরে রেখে মালিকেরা পালিয়ে যায়।’

বিবিসির তথ্যমতে, লেবাননে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় সবাই নিজ দেশে থাকা পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বাস্তবতার মধ্যে বাস করেন। এর মধ্যে আফ্রিকা থেকে আসা গৃহকর্মীরা গড়ে ২৫০ মার্কিন ডলার এবং এশিয়া থেকে আসা গৃহকর্মীরা গড়ে ৪৫০ ডলার করে মাসে আয় করতে পারেন।

ম্যাথিউ লুসিয়ানো বলেন, কোনো ওয়ার্ক পারমিটের মতো বিষয় না থাকায় পুরোনো কাফালা (স্পন্সর) পদ্ধতিতেই তাদের কাজ করতে হয়। পাসপোর্ট জমা রাখাসহ নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়। পাশপাশি অন্য অধিকারের জায়গাগুলো প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে অভিবাসী গৃহকর্মী নির্যাতন সেখানে একটি সাধারণ ঘটনা।