তীব্র খরা চলছে ইরানে, সেটির প্রভাবে রাজধানী তেহরানে পান করার মতো সুপেয় পানির মজুদ ফুরিয়ে আসছে। সমস্যা এতটাই প্রকট যে, দুই সপ্তাহ পর তেহরানে আর পানযোগ্য পানি না থাকার মতো শঙ্কাও দেখা দিয়েছে!
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ নিউজ এজেন্সিতে গতকাল রোববার প্রচারিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
তেহরানের মানুষের পানযোগ্য পানির উৎস মূলত পাঁচটি বাঁধ। এর মধ্যে প্রধান বাঁধ - আমির কবির বাঁধে পানি প্রায় নেই বললেই চলে! আইআরএনএ নিউজে তেহরানের পানি সরবরাহকারী কোম্পানির পরিচালক বেহজাদ পারসা বলেছেন, এই মুহূর্তে আমির কবির বাঁধে ‘মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ কিউবিক মিটার পানি আছে, যা এর ধারণক্ষমতার ৮ শতাংশ!’ এই পানি দিয়ে তেহরানে শুধু ‘দুই সপ্তাহের মতো’ পানযোগ্য পানি সরবরাহ করা যাবে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বেহজাদ পারসা।
অন্য চারটি বাঁধে মজুদ থাকা পানির পরিমাণ জানাননি বেহজাদ পারসা। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অন্য চারটি বাঁধের মধ্যে লার, লাতিয়ান, মামলু বাঁধেও পানি আছে ধারণক্ষমতার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মতো। তালেকান বাঁধে পানি কতটুকু আছে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে শুকিয়ে যেতে থাকা পাঁচটি বাঁধের আলোচনায় এই বাঁধের নামও এসেছে।
কয়েক দশকের মধ্যে এবারই তেহরানে সবচেয়ে ভয়ংকর খরা চলছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে লেখা, গত মাসে স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানে এবার বৃষ্টিপাতের যে অবস্থা, এতটা কম বৃষ্টির উদাহরণ গত প্রায় এক শতাব্দীতে নেই।
১ কোটি মানুষকে ধারণ করা মেগাসিটি তেহরান অবস্থিত আলবোর্জ পর্বতমালার দক্ষিণ ঢালে। প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার আলবোর্জ পর্বতমালা বেশিরভাগ সময়েই থাকে তুষারে ঢাকা। এই পর্বতমালা থেকে উৎসারিত নদীগুলোই তেহরানের বেশ কয়েকটি জলাধারের পানির উৎস। এক বছর আগেও আমির কবির বাঁধে ৮ কোটি ৬০ লাখ কিউবিক মিটার পানি ছিল বলে জানিয়েছেন বেহজাদ পারসা। কিন্তু এই এক বছরে তেহরানে ‘বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০০ শতাংশ কমেছে’ বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইরানিয়ান সংবাদমাধ্যমের মতে, তেহরানের মানুষের জন্য প্রতি দিনে প্রায় ৩০ লাখ কিউবিক মিটার পানির দরকার হয়।
পানি বাঁচানোর চেষ্টা থেকে গত কিছুদিনে তেহরানের বেশ কিছু অঞ্চলে বারবার পানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। পুরো গ্রীষ্মেই পানি সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘটনা ছিল নিয়মিত। পানি ও বিদ্যুৎ বাঁচানোর তাগিদে গত জুলাই-আগস্টে সপ্তাহে দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি রাখা হয়েছিল। প্রচণ্ড তাপদাহে এবার তেহরানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে, ইরানের আরও কিছু অঞ্চলে ছাড়িয়ে গেছে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। সেই তাপদাহের সময়েও লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সে সময়ে বলেছিলেন, ‘এখন যতটা বলা হচ্ছে, পানির সংকট এর চেয়েও গুরুতর।’
পানির সংকট ইরানে - বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণের রুক্ষ অঞ্চলগুলোতে – সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারকে এই পানি ঘাটতির কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দিনে দিনে বাড়তে থাকা নেতিবাচক প্রভাব তো আছেই!
ইরানের প্রতিবেশি ইরাকও ১৯৯৩ সালের পর এবারই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতহীন, শুকনো বছর কাটাচ্ছে। বৃষ্টি কম হওয়া এবং নদীর ওপরের অংশে বাঁধের কারণে এরই মধ্যে তিগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর জলসীমা ২৭ শতাংশের মতো নিচে নেমে গেছে, যে কারণে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে তীব্র পানিসংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।