সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষস্থানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেছেন, আগামী মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি চাঁদ দেখা যাবে না। ওদিকে সেই দিনই সৌদি আরবের দিক থেকে চাঁদ দেখার ঘোষণা এবং মুসলিম বর্ষপঞ্জির পবিত্র রমজান মাসের শুরু ঘোষণা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুইয়ে মিলে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবার ঐতিহ্য ভেঙে সৌদি আরবের চেয়ে এক দিন পরে রমজান মাস শুরু করতে পারে। এই সম্ভাবনা জাগছে এমন এক সময়ে, যখন দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্রমশ অবনতিশীল হয়ে যাচ্ছে।
ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলো যে দেশে, সেই সৌদি আরব আগেও অনেক বছরই এমন কিছু দিনে চাঁদ দেখা গেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে, যখন বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চাঁদ দেখা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছিলেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ এই সমালোচনার উত্তর কখনো দেয়নি।
মুসলিমরা চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুসরণ করেন, যেখানে ১২টি মাস থাকে এবং প্রতিটি মাস ২৯ বা ৩০ দিনের হয়। রমজান মাস কবে শুরু হবে, সেটা নির্ভর করে চাঁদ কবে প্রথম দেখা যাচ্ছে সেটির ভিত্তিতে।
সৌদি আরব ‘উম্ম আল কুরা’ নামে একটি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে, যা তৈরি হয় গণনার ওপর ভিত্তি করে এবং এই ক্যালেন্ডারে গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করা থাকে। উম্ম আল কুরা ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের রমজানের প্রথম দিন হবে বুধবার ১৮ ফেব্রুয়ারি।
কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাতে শারজাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শারজাহ অ্যাকাডেমি ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি (এসএএএসএসটি) গত সপ্তাহে জানিয়েছে যে, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি চাঁদ দেখতে পাওয়া অসম্ভব, এমনকি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও নয়।
এসএএএসএসটি জানিয়েছে, রমজানের প্রথম দিন হবে বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি।
আলাদা করে আবুধাবি-ভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মোহাম্মদ ওদেহ, যিনি কিনা আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্র এবং ইসলামিক ক্রিসেন্ট অবজারভেশন প্রজেক্ট (আইসিওপি)-এর পরিচালক, তিনি বলেছেন যে, চাঁদ মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরবে দেখা যাবে না। ‘এমন খবর, যদি আসে শেষ পর্যন্ত, সে ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে বুঝতে হবে যে আকাশে চাঁদ না থাকলেও কেউ হয়তো মনে করতে পারেন যে তারা চাঁদ দেখেছেন।’
চাঁদ ‘বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেখা অসম্ভব’
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যতই বলুন যে মঙ্গলবার চাঁদ দেখতে পাওয়া অসম্ভব, তবু সৌদি আরব বুধবারই রমজান শুরু হচ্ছে বলে ঘোষণা করবে, যেমনটা তারা আগেও অনেক বছরেও করেছে। যুক্তরাজ্যের নিউ ক্রিসেন্ট সোসাইটি নামের একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক ইমাদ আহমেদ গ্রিনউইচের রোয়াল অবজারভেটরির সঙ্গে মিলে ইসলামিক ক্যালেন্ডার বিষয়ক একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রোগ্রাম চালান।
তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী চাঁদ দেখতে পাওয়া অসম্ভব- সেটা উচ্চ ক্ষমতার টেলিস্কোপ দিয়ে বা নিখুঁত চোখে যেভাবেই দেখুন। শুধু সৌদি আরব নয়, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকা বা ইউরোপের কোথাওই সেদিন চাঁদ দেখা যাবে না। তবুও আমাদের ধারণা, সৌদি আরব মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারিতেই চাঁদ দেখা হয়েছে বলে দাবি করবে, যদিও সেটা বিজ্ঞানসম্মত হবে না।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ - বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো - সাধারণত সৌদি আরবের চাঁদ দেখার ঘোষণা অনুসরণ করে।
তাহলে সংযুক্ত আরব আমিরাত এ বছর কী করবে?
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে উষ্ণতা কমে গেলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবারও সৌদি আরবের সিদ্ধান্তই অনুসরণ করবে। ইমাম আহমেদ মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘এবার আমরা দেখেছি যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেশ কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী আগেই নিশ্চিত করেছেন যে, মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও চাঁদ দেখা যাবে না। ওমানের সিনিয়র চাঁদ দেখা কমিটিও জানিয়েছে চাঁদ দেখা সম্ভব নয়। তবে আমরা আগে কখনও দেখিনি যে সংযুক্ত আরব আমিরাত রমজান ও ঈদের তারিখের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের ঘোষণার বাইরে গেছে।’
যদি সৌদি আরব মঙ্গলবার চাঁদ দেখা হয়েছে বলে ঘোষণা করে, সে ক্ষেত্রে আমিরাত কী করবে? ইমাম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ধারণা, সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিয়েই রমজান শুরু করবে, যদিও তাদের নিজের দেশীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এটিকে বিজ্ঞানসম্মত বলে মনে করেন না।’
বাকি দেশগুলোর পদ্ধতি এবং স্থানীয় চাঁদ দেখা
যুক্তরাজ্যের হিজ মেজেস্টি’স নটিক্যাল অ্যালম্যানাক অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সৌদি আরবে চাঁদ দেখা যাবে না।
সৌদি আরব গণনা ভিত্তিক ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা একমাত্র দেশ নয়। তুরস্কও এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে, তবে তারা চাঁদ দেখার দাবি করে না।
২০২৪ সালে সৌদি আরবের ১০ মার্চে চাঁদ দেখতে পাওয়ার ঘোষণা মেনে নেয়নি ওমান ও জর্ডান, এই দুই দেশ সে বছর ১২ মার্চ থেকে রমজান পালন শুরু করে।
যেসব দেশে সরকারিভাবে চাঁদ দেখা কমিটি নেই - যেমন যুক্তরাজ্য - সেখানে অনেক মুসলিম সৌদি আররের ঘোষণা অনুসরণ করে। যদিও কিছু ধর্মীয় পণ্ডিত বলেছেন, অন্য দেশে থাকা মানুষকে সৌদি আরবের ঘোষণা অনুসরণ করতে হবে না।
যুক্তরাজ্যে অনেক সংখ্যক মুসলিম আস্তে আস্তে স্থানীয়ভাবেই চাঁদ দেখা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে। আহমেদের নিউ ক্রিসেন্ট সোসাইটি দেশজুড়ে চাঁদ দেখা কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং যুক্তরাজ্যের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ ইসলামিক ক্যালেন্ডার গঠনের চেষ্টা করছে।
তবে মিডল ইস্ট আই লিখেছে, এখনও এই সম্ভাবনাও আছে যে সৌদি আরব মঙ্গলবার চাঁদ দেখতে না পাওয়ার ঘোষণা দেবে এবং রমজান শুরু হবে বৃহস্পতিবার। তবে সে ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত ক্যালেন্ডার থেকে সরে আসতে হবে সৌদি আরবকে – শেষ পর্যন্ত সেটা তারা করলে সেটিকে নীতিগতভাবে ঐতিহাসিক পরিবর্তনই ধরে নেবেন অনেকে।