ইরানের চাপে এবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে পিছু হটছে আমেরিকা? ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে যেন এল নতুন বিস্ফোরক মোড়। একদিকে ইরানের সঙ্গে ভয়ংকর সামরিক সংঘাত, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর একের পর এক হামলা। আর ঠিক এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই ইরাক থেকে সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন।
প্রশ্ন উঠছে—এটা কি নিছক পুরোনো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন? নাকি ইরানের হুমকিতে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় দ্রুত সরে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠকের পর আল-জাইদি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—৩০ সেপ্টেম্বরই শেষ তারিখ। এই দিনেই ইরাকে গ্লোবাল কোয়ালিশনের সামরিক মিশন শেষ হবে এবং শেষ মার্কিন সেনাও দেশ ছাড়বে। এরপর ১ অক্টোবর থেকে ইরাকের মাটিতে কোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থাকবে না। অর্থাৎ ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের মধ্য দিয়ে যে মার্কিন সামরিক অধ্যায় শুরু হয়েছিল, দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেটির অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
এখানেই গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ। মার্কিন সেনারা যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দিস্তানে থাকা মার্কিন অবস্থানগুলো একের পর এক হামলার মুখে পড়েছে; বিশেষ করে এরবিলে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত যত ছড়িয়েছে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার চাপও তত বেড়েছে। যদিও ওয়াশিংটন বলছে, এই প্রত্যাহার হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
তবে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে সামনে এনে ওয়াশিংটন এখন সামরিক উপস্থিতির বদলে অন্য ধরনের সম্পর্ক গড়তে চাইছে। সেনা কমবে, ঘাঁটি কমবে; কিন্তু কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকবে। এখানে আরও একটি বড় পরিবর্তন আসছে। ইরাক চাইছে দেশের অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র রাষ্ট্রের হাতে থাকবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বাইরে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র থাকবে না।
কিন্তু বাস্তবে সেটাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা; কারণ ইরাকে রয়েছে শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী। তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র চলে গেলে ইরাকের নিরাপত্তা ভারসাম্য কোথায় দাঁড়াবে? ইরানের প্রভাব কি আরও বাড়বে? নাকি বাগদাদ নিজের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করবে?
একসময় ইরাকে মার্কিন সেনা ছিল ১ লাখ ৭০ হাজারের ওপর। আজ সেই উপস্থিতি হাতে গোনা কয়েক শতে নেমে এসেছে। কিন্তু এবার প্রত্যাহারের শেষ অধ্যায়—৩০ সেপ্টেম্বর। এই তারিখকে আল-জাইদি বলেছেন ‘ফিক্সড অ্যান্ড ফাইনাল’। শেষ হতে যাচ্ছে ২০০৩ থেকে শুরু হওয়া একটি দীর্ঘ সামরিক অধ্যায়।
অন্যদিকে রয়েছে বদলে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্য, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বাস্তবতা। তাই প্রশ্নটা এখন আর শুধু—আমেরিকা ইরাক ছাড়বে কি না তা নয়; প্রশ্ন হলো—আমেরিকা চলে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত শূন্যস্থান কে পূরণ করবে? মার্কিন সেনাদের জায়গা কি আরও শক্তভাবে দখল করবে তেহরানের প্রভাব?
আর ৩০ সেপ্টেম্বর যখন শেষ মার্কিন সেনা ইরাকের মাটি ছাড়বে, সেদিন কি সত্যিই শেষ হবে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য সামরিক অধ্যায়? নাকি এটা হবে আরও বড় কোনো কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের শুরু? কারণ সেনারা হয়তো ঘাঁটি ছাড়ছে—কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াই এখনো শেষ হয়নি।