তোশাখানা-২ মামলায় নতুন করে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে গতকাল শনিবার ১৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এফআইএ) বিশেষ আদালত। দুজনকে ১ কোটি ৬৪ লাখ রূপি জরিমানাও করা হয়েছে।
২০২৩ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দুর্নীতির কয়েকটি মামলায় আগে থেকেই কারাবন্দী ইমরান খান, যার মধ্যে তোশাখানা নিয়ে আগেও একটি মামলা ছিল। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের নেতার বিরুদ্ধে নতুন করে তোশাখানা মামলার এই রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন পাকিস্তানের অনেকেই।
গতকাল থেকেই এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে পাকিস্তানজুড়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন ইমরান খান। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য ডন-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, তোশাখানা-২ মামলার রায়কে ইসলামাবাদ হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানাবে ইমরান খানের দল পিটিআই।
তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে আলাপে ইমরান খান বলেছেন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ইমরান খানের একাউন্ট থেকে পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘সোহাইল আফ্রিদিকে (খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী) আমি বার্তা পাঠিয়ে রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে বলেছি। পুরো দেশকেই তার অধিকারের জন্য জেগে উঠতে হবে।’
লম্বা পোস্টে ইমরান খান বলেছেন, গত তিন বছরে পাকিস্তান ও দেশটির বিচারবিভাগ যেভাবে চলেছে, তাতে নতুন করে তোশখানা মামলার এই রায়ে তিনি অবাক হননি। ‘গত তিন বছরের সব ভিত্তিহীন সিদ্ধান্ত ও রায়ের মতো, তোশাখানা-২ মামলার রায়ও আমার কাছে নতুন কিছু নয়। কোনো প্রমাণ ছাড়া, আইনি প্রক্রিয়া না মেনে বিচারক তড়িঘড়ি করে মামলার রায় দিয়ে দিয়েছেন।’ যোগ করেছেন, মামলার শুনানিতে তাঁর আইনি দলের ‘কথা শোনাই হয়নি।’
পিটিআই নেতা বলেছেন, আইনের শাসন ও সংবিধান পুনর্বহাল করার লক্ষ্যে ইনসাফ লয়্যারস ফোরামসহ আইনজীবীদের সংঘগুলোকে ‘সামনে এগিয়ে আসতে হবে।’ স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনৈতিক উন্নতিও সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ইমরান খান।
ইমরান খানের বিরুদ্ধে নতুন এই মামলার রায় নিয়ে এক বিবৃতিতে তাঁর দল পিটিআই বলেছে, এই রায় ‘নির্লজ্জভাবে অসাংবিধানিক, অবৈধ, বিদ্বেষপরায়ণ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চূড়ান্ত জঘন্য নিদর্শন ও নিগ্রহের কেতাবি রূপ।’ এই রায়কে ইমরান খানের কারাবাস আরও বাড়িয়ে দেওয়া এবং জেঁকে বসা শাসক চক্রের জন্য সাময়িক প্রশান্তি বলে উল্লেখ করেছেন তারা। এই রায়ের মাধ্যমে পাকিস্তানে আইনের শাসনকে সমাধিত করা হয়েছে জানিয়ে তারা বলেছেন, ‘আজ্ঞাবহ’ বিচার বিভাগের মাধ্যমে প্রশাসনিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিচ্ছে পাকিস্তানের শাসকরা।
পিটিআইয়ের উচ্চপর্যায়ের নেতা আসাদ কায়সারকে পাশে নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল সালমান খান রাজা বলেছেন, কোর্টরুমে তাঁর মুখ্য আইনি পরামর্শক ব্যারিস্টার সালমান সাফদারের সঙ্গে আলাপ করেছেন ইমরান খান, এবং সেখানে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছেন। নিজের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে জানিয়ে ইমরান সেখানে বলেছেন, ‘আমি আমার অবস্থানে অনড় ও দৃঢ় এবং আমি কারও কাছেই ক্ষমা চাইব না, যা হবার হবে।’
মামলাটাতে দুর্বল সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে রায় দেওয়া হয়েছে জানিয়ে সালমান রাজা বলেছেন, ‘একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল তাঁর ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে, সেটাকেই প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া হলো!’
আসাদ কায়সার বলেছেন, এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ ছাড়া আর রাস্তা খোলা নেই। তবে প্রতিরোধটা শান্তিপূর্ব, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক নীতির ভিত্তিতে করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। পিটিআই তাদের প্রতিষ্ঠাতার জন্য ন্যায়বিচার চায় এবং সেটা না হওয়া পর্যন্ত তাদের সংগ্রাম চলবে বলেও জানিয়েছেন আসাদ কায়সার।
ইমরান খানের বোন আলিমা খান সংবাদমাধ্যমে এই রায়ের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আগে থেকে লিখে রাখা স্ক্রিপ্টে’র ভিত্তিতে এই রায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই স্ক্রিপ্টের আগামাথা তিনি বুঝতে পারছেন না জানিয়ে আলিমা খান বলেছেন, যাঁরা এই স্ক্রিপ্টের পেছনে আছেন, তাঁরা ‘খুব একটা বুদ্ধিমান নন।’
ইমরান খানের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবি – যিনি কিনা একজন গৃহিনী – তাঁকেও কেন কারাবন্দী রাখা হয়েছে, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আলিমা খান।
পিটিআই নেতা ওমর আইয়ুব এক্স পোস্টে এই রায় নিয়ে বলেছেন, ‘পাকিস্তানে আইনের শাসন বলে কিছু নেই।’