দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনের হাতে সময় আছে ৮০ দিন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে ভোট হতেই হবে। নির্বাচন কমিশনও সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক প্রস্তুতিও শেষ করে ফেলেছে। তবে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ টি এম শামসুল হুদা আমাদের প্রায়ই বলতেন, জাতীয় নির্বাচন একটা মহাযজ্ঞ। এটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা যায় না সব ঠিক আছে কি না। ঠিকমতো সব হচ্ছে কি না। তবে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা নির্বাচন করতে করতে অভ্যস্ত। তাঁরা শেষ পর্যন্ত কীভাবে যেন সবকিছু গুছিয়ে ফেলেন।
শামসুল হুদা ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিইসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সময় মনে রাখার মতো অবাধ–সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন করে কমিশন ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
যাই হোক, দেখা যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ কত তারিখে, তা জানিয়ে দিতে কোনো কোনো গণমাধ্যম উঠে পড়ে লেগেছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব তারিখ লেখা হয়েছে, তার মধ্যে ৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ৯ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ লেখা হয়েছে।
কোনো কোনো গণমাধ্যম তারিখ সুস্পষ্টভাবেই নির্ধারণ করে দিয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম ৯ দিনের মধ্যে ১, ২ ও ৭ জানুয়ারি তারিখ এখন পর্যন্ত ফাঁকা আছে। ভোটের এখনো অনেক বাকি। প্রতিযোগিতার মধ্যে এই তারিখগুলোও হয়তো গণমাধ্যমে ভোটগ্রহণের তারিখ বলে দেখা যেতে পারে। কিন্তু ভোট তো হবে এক দিন। বিভিন্ন গণমাধ্যম যে তারিখ ইতিমধ্যে দিয়েছে, তার মধ্যে থেকে যদি বেছে নেওয়া হয় তাহলেও একটি তারিখ সঠিক হবে। বাকিগুলো ভুল হবে। তার মানে হচ্ছে কিছু গণমাধ্যমের সংবাদ ভুল হওয়ার আশঙ্কা আছে। ফলে ওই গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কিন্তু তখন এক ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
কিন্তু কথা হচ্ছে ভোটগ্রহণের তারিখ জানানোটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হলো? কেননা নির্বাচন কমিশন তো অনেক দিন আগে থেকেই বলে আসছে জানুয়ারির প্রথম ভাগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। একটা সময় বলা হতো ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভোট হবে। এখন তো বলাই হচ্ছে চলতি বছরের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল আর ভোটগ্রহণ হবে আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে।
এটা নিয়ে রিপোর্ট করার দরকার আছে কি না, জানতে চাইলে ওই সময়ে নির্বাচন কমিশন বিটের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সাংবাদিক আশিস সৈকত বলেছিলেন, ‘এটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় না। কমিশন তো বলেই দিয়েছে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ভোট। ’ আশিষ সৈকত সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ যে কথাটি বলেছিলেন, তা হলো—কমিশন হয়তো এখন এটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু ঘোষণার সময় যদি এক দিন আগে–পিছে হয়, তাহলে তো সবাই ভুয়া বলবে। দরকার নেই লেখার। এটা কমিশনের কাজ। কমিশনকে করতে দেন।
নির্বাচন কমিশন বিটের একসময়ের ঝানু রিপোর্টার ছিলেন শওকত মাহমুদ (জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি)। ওই সময়ে তিনি একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘কবে ভোট এটা নিয়ে নিউজ করতে হবে, এটা মাথায় রাখতাম না। এটা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার। তাদের ঘোষণা করতে দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোও কখনো কিন্তু কমিশনকে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখে ভোট করতে জোর করে না। একটি সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী কত দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে, তা সংবিধানে–আইনে বলাই থাকে।
ভোটের তারিখ কীভাবে নির্ধারণ হয়:
ভোটের তারিখ কীভাবে নির্ধারণ হয় বা কী কী বিষয় সামনে রেখে তারিখ নির্ধারণ হয়—এটা নিয়ে নির্বাচন কমিশন বিটে কাজ করার সময় কৌতূহল ছিল। অনেক নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে এ নিয়ে জানতেও চেয়েছি। তারা ভোটের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় সামনে রাখেন। তবে এটা কোনো আইন না। প্রথা হিসেবে এই বিষয়গুলো সামনে আনেন তারা।
একটি গোলটেবিল আলোচনায় বক্তা হিসেবে এসেছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা। সেই অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহের জন্য আমিও ছিলাম সেখানে। তাঁর কাছে ভোটগ্রহণের তারিখ নিয়ে কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, জাতীয় নির্বাচনের তারিখ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে ভিন্ন কিছু পন্থা কমিশন কর্মকর্তারা সামনে আনেন। যেমন সাধারণ ছুটি, ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসব, সাপ্তাহিক ছুটি এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়। তিনি বলেছিলেন, জাতীয় নির্বাচন যেহেতু ৯০ দিনের মধ্যে করতে হয়, এ কারণে ভোটগ্রহণের পর অন্তত কিছু দিন সময় হাতে রাখাটা ভালো। কোনো কারণে ভোট পেছাতে হলে, যেন হাতে সময় থাকে। তা ছাড়া বড় অংশের ভোট বাতিল হলে পরে যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোট নেওয়া যায়।
এঁদের সঙ্গে এবং আরও অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ভোটের তারিখ নির্ধারণে কিছু মজার তথ্য পেয়েছিলাম। তবে এগুলো যে কমিশন শতভাগ মেনে চলে, তা কিন্তু নয়। কমিশন বলে থাকে—সুবিধাজনক দিনে তারা ভোটের দিন নির্ধারণ করে। তবে শুক্রবার ভোট করতে চায় না কমিশন। কেননা ভোটগ্রহণে কোনো বিরতি দেওয়ার সুযোগ নেই।
যেমন একবার একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারের সঙ্গে মিলিয়ে শনিবার ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হলো। উদ্দেশ্য এলাকার লোক দুদিন ছুটি পাবেন। দেখা গেল দুদিন ছুটিতে বেশ কিছু স্কুলের গার্ডরা তালা দিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। কেননা আগের দিন শুক্রবার যে সেখানে কিছু কাজ হবে এটা নাকি তাঁরা বুঝতেই পারেননি। এ কারণে ওই সময় ভোটের তারিখ নির্ধারণের সময় সাপ্তাহিক ছুটির কথাটা মাথায় রাখা হতো। তাছাড়া সপ্তাহের ছুটির কারণে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু তাৎক্ষণিক কেনাও সম্ভব হতো না।
বড় সিটির নির্বাচন সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে করতে গিয়ে ঝামেলা হতো। সাপ্তাহিক দুদিন ছুটির কারণে বড় সমস্যায় পড়তে হয়েছে কমিশনকে। বিশেষ করে ভোটার উপস্থিতি কমে যায়। কেননা বড় শহরের অনেক ভোটার বিভিন্ন এলাকা থেকে শহরে এসে থাকে। দুদিন সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে ভোটের দিনের বন্ধের কারণে বেশির ভাগই বাড়িতে চলে যান। অনেকে আবার এই সময় বেড়াতে চলে যান।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, জাতীয় নির্বাচন সোমবার বা বুধবার হওয়াটাই ভালো। ২০০১ ও ২০০৮–এর নির্বাচন এভাবেই হয়েছে। ভোটের আগে–পরে সবকিছু খোলা থাকে। এতে সবাইকে পাওয়া যায়।
অবশ্য ২০১৪ ও ২০১৮–এর নির্বাচন রোববার হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনারদের মতে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে না করা ভালো। এতে ভোটাররা লম্বা ছুটিতে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তবে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন–উপজেলা নির্বাচন সাপ্তাহিক কোনো ছুটির দিনে করলেও কোনো ক্ষতি হয় না। কেননা এখানকার ভোটাররা মূলত এলাকাতেই থাকেন। আবার সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে করা হলে অন্য এলাকায় যারা কাজের কারণে থাকেন, তাঁরা একদিন ছুটি নিয়ে এসে ভোট দিতে পারেন। বাড়িতে বেড়ানোটাও হয়ে যায়।