ইসরায়েলের লাগাম টানতে চাপের মুখে বাইডেন?

গাজায় মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। এমন পরিস্থিতিতে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের লাগাম টানতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে তাঁর দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, নিজ দল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যরা এবং আমেরিকার মিত্র দেশগুলো।

এদিকে ইরানসহ আরও বেশ কয়েকটি আরব দেশের নেতা ও আমেরিকার বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া খোদ মার্কিন প্রশাসনেরই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছেন। গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা বারবারা লিফ কংগ্রেসকে বলেছেন, ‘গাজায় অনেক বেশি ফিলিস্তিনি মারা যাচ্ছে। মৃতের সংখ্যা যত বলা হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। সুতরাং অবিলস্বে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু থামানো দরকার।’

এমনকি বাইডেনের সাবেক নির্বাচনী প্রচারকর্মীরাও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে খোলা চিঠি পাঠিয়েছিলেন বাইডেনের কাছে। সব মিলিয়ে ক্রমবর্ধমান চাপ ও অস্বস্তির মধ্যে রয়েছেন জো বাইডেন। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি মিটিংয়ে আমেরিকার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হতাশা ও সমালোচনামূলক বক্তব্যের বিষয়টি বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করা হয়। এতে আরও চাপের মধ্যে পড়েছেন বাইডেন।

একইভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলও। গত সোমবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলি কোহেন বলেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে কূটনৈতিক চাপের মুখোমুখি হওয়ার আগে ইসরায়েলের হাতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় ছিল। তবে অপর এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আমরা যে মিশন (হামাসকে নির্মূল করা) নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছি, তা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত থামব না। এ ব্যাপারে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কারণ এটি ইসরায়েলিদের জন্য একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ।’

সুতরাং স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে ইসরায়েলে মতবিরোধ রয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতর থেকে ক্রমাগত চাপ বাড়ায় সম্প্রতি সুর পাল্টেছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তাঁকে বিভিন্ন সময়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। যেমন: গত সোমবার গাজার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল আল শিফায় হামলার পর বাইডেন বলেছেন, ‘হাসপাতালগুলোকে অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে।’

আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন কিরবিও বলেছেন, ‘ওয়াশিংটন কখনোই হাসপাতালে হামলা করাকে সমর্থন করে না। কারণ সেখানে অসংখ্য নিরীহ, অসহায় ও অসুস্থ মানুষ তাদের ন্যায্য চিকিৎসাসেবা নিতে যান।’

গাজায় মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। ছবি: ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সৌজন্যেমার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টে গতকাল শনিবার একটি নিবন্ধ লিখেছেন জো বাইডেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘যেহেতু আমরা ফিলিস্তিনে শান্তি আনার চেষ্টা করছি, সেহেতু গাজা ও পশ্চিম তীরকে শাসন করার ক্ষমতা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা উচিত। কারণ আমরা সবাই একটি দ্বি–রাষ্ট্রীয় সমাধানের ব্যাপারে কাজ করছি।’

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইসরায়েলের লাগাম টানতে সবাই কেন আমেরিকাকে চাপ দিচ্ছে? কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা বলেন, ছাগল নাচে খুঁটির জোরে। আর ইসরায়েলের সেই খুঁটি হচ্ছে আমেরিকা। যেহেতু স্বেচ্ছায় ইসরায়েল এ যুদ্ধ থামাবে বলে মনে হচ্ছে না, সেহেতু আমেরিকাকে চাপ দেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েলকে থামানো ছাড়া আর উপায় নেই। 

গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হয়। ইসরায়েলের হামলায় হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদ, গির্জা—কিছুই বাদ যাচ্ছে না। ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় এ পর্যন্ত সাড়ে ১১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ হাজারের বেশি শিশু। এ ছাড়া আহত হয়েছেন প্রায় ৩২ হাজার মানুষ।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, গাজা এখন শিশুদের কবরস্থান হয়ে উঠেছে। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে যাওয়া ছাড়া এর কোনো সমাধান নেই।

তবে যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে ‘জিম্মি’ শব্দটি একটি অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে। কারণ হামাসের হাতে আমেরিকার নাগরিকসহ অন্তত ২০০ জন ইসরায়েলি জিম্মি রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘জিম্মিদের মুক্তি ছাড়া যুদ্ধবিরতি ঘটবে না, এটাই এখন মূল বিষয়।’

গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হয়। ছবি: রয়টার্সজিম্মিদের মুক্তির বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে ইতিমধ্যেই ইসরায়েল, পশ্চিম তীর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার এবং জর্ডান ছুটে বেড়িয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ দুই কর্মকর্তা লিফ ও ব্রেট ম্যাকগার্ক। এসব ছোটাছুটি দেখেই বোঝা যায়, আশু যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে বাইডেন প্রশাসন।

তবে ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসি থিংক ট্যাংকের ডেনিস রস বলেছেন, ‘আমি মনে করি না যে, তিনি চাপের মধ্যে আছেন। তিনি এসব চাপের ব্যাপারে উদাসীন। যদিও তাঁকে সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে সোচ্চার আহ্বান জানাতে দেখা যাচ্ছে। তবে আমি মনে করি, তিনি ইসরায়েলিদের আরও কিছুটা সময় দিতে ইচ্ছুক।’

ইসরায়েলকে সেই সময়টুকু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলেই দেবেন কিনা, সেটিই এখন দেখার। 

তথ্যসূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, আল জাজিরা ও রয়টার্স