আগামী ৬ বছরে যা করতে চান পুতিন

জাতীয় নির্বাচনের অনেক আগেই ধারণা করা হয়েছিল, ভ্লাদিমির পুতিনই হচ্ছেন রাশিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। নির্বাচন শেষে হলোও তাই। তিন দিনের ভোটের পর রোববার দেশটির নির্বাচনের প্রাথমিক ফল থেকে জানা যায়, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন পুতিন। এর মধ্য দিয়ে টানা পাঁচবার দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতায় তিনি। তবে এবারের ছয় বছরের মেয়াদ পুতিনের সামনে নিয়ে এসেছে বড় সব চ্যালেঞ্জ।

অবশ্য নিজের পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নির্বাচনের আগেই গত মাসে জানিয়ে দিয়েছেন পুতিন। আগামী ২০৩০ সালে রাশিয়াকে কেমন দেখতে চান, জানিয়ে দিয়েছেন সেই রূপরেখা। তবে এর আগে তাঁর মতোই দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা জোসেফ স্তালিনের নাম নেননি একবারও। 

রাশিয়ার ফেডারেল অ্যাসেম্বলিতে পুতিন বলেছেন সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুর কথা। এ ছাড়া তাঁর কথায় ইউক্রেন তো ছিলই। আদতে আগামী বছরগুলোতেও পুতিনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকবে এই ইউক্রেন ইস্যু। এমনকি দেশটির অর্থনীতিতেও এখন এই ইস্যু জটিল সব সমস্যা তৈরি করে রেখেছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের জন্য যে রূপরেখা পুতিন দিয়ে যাচ্ছেন, এর মধ্যে একটি হচ্ছে জনসংখ্যা সংকট। এই সময়ে দেশটিতে দমন–পীড়ন ব্যাপক হারে বাড়ানো হবে। আর এসবের প্রভাবে অর্থনীতি পড়বে সংকটে। এ ছাড়া ইউক্রেন ছাড়াও সংকট বাড়াতে জড়িয়ে যাবে আরও বেশ কয়েকটি দেশ। সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ব্রেন্ডান কোল। 

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ভোট গণনা করেন কর্মকর্তারা। গত রোববার সেন্ট পিটার্সবার্গে। ছবি: রয়টার্স অর্থনীতি
রুশ মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ছেই। আগামী বছরগুলোতে এই ধারা বজায় থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। অন্তত পশ্চিমারা এমনটাই চাইছেন। এতে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক খাতে বিনিয়োগ সংকটে পড়তে পারেন পুতিন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে।

রাশিয়ার সরকারবিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই মিনিয়াইলো নিউজউইককে বলেন, ‘সোভিয়েত যুগের পর কখনো এমন হয়নি। এই প্রথম ২০২৪ সালে সামরিক বাজেট সামাজিক উন্নয়নমূলক বাজেটের চেয়ে বেশি। এ বছর রাশিয়া যে ব্যয় ধরেছে, এর তিন ভাগের একভাগ এই প্রতিরক্ষা খাতে যাবে। মানুষ কিন্তু এই যুদ্ধ নিয়ে এখন ক্লান্ত। যুদ্ধে আর বিনিয়োগের পক্ষে না, তারা চাচ্ছে আগে দেশের ভেতরে উন্নতি।’

নির্বাচনের আগে সম্প্রতি একটি জরিপ পরিচালনা করে রাশিয়ার ক্রনিকলস নামের একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। এতে দেখা যায়, রাশিয়ার ৮৩ শতাংশ মানুষ চায় পুতিন ক্ষমতায় এসে যেন এবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেন।

ন্যাটো, পশ্চিমা সরকার ও ইউক্রেন
রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে প্রস্তুত—অবশেষে মুখ থেকে কথাটা সরাসরি বেরই করে ফেললেন পুতিন। গত সপ্তাহে তিনি আরও বলেন, মার্কিন নির্বাচনে যে–ই আসুক না কেন, তারা একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আসলেই কি তাই?

ব্যাপারটা এত সহজ হবে না বলেই মনে হচ্ছে। কলোরাডো স্কুল অব মেইনসের ইতিহাসের অধ্যাপক ক্যান অসগুড তো সে কথাই বলছেন। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় ও অনুবর্তী ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ হতে পারে ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কেননা এ নির্বাচনের পর ইউক্রেনে সহায়তার ব্যাপারে আমেরিকা নতুন পথে হাঁটতেও পারে।

এমনটা হলে পুতিনের জন্য বড় বিজয় হবে। যদিও ইউক্রেনের মাত্র কয়েকটি এলাকা দখল করেছেন তিনি। এরপরও আমেরিকার সহায়তা না দেওয়ার মানে হচ্ছে, পুতিনের জয়। এর রেশ থেকে যাবে আরও কয়েক বছর। অধ্যাপক ক্যান অসগুড বলছেন, এতে ইউক্রেন ইস্যুতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারেন পুতিন। 

তবে এমন হলে পুতিন পোল্যান্ডে কি হামলা চালাবেন? ন্যাটোর সঙ্গে কি যুদ্ধে জড়িয়ে যাবেন? ক্যান অসগুড অবশ্য এমন কোনো আশঙ্কা দেখছেন না। তিনি বলেন, এমনকি ন্যাটো থেকে আমেরিকা সরে গেলেও হয়তো পুতিন এমন করবেন না।

২০১৭ সালে জার্মানিতে জি২০ সম্মেলনে ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সপুতিন তবে কী করবেন
এর চেয়ে সাইবার যুদ্ধের দিকেই মনোযোগ দিতে পারেন পুতিন। অন্যভাবে বললে, আক্রমণাত্মক তথ্যযুদ্ধের পরিকল্পনা করে রেখেছেন তিনি। এর মাধ্যমে ন্যাটোতে তিনি ভাঙন ধরাতে চাইবেন। সেটা যেকোনো মূল্যেই হোক।

অধ্যাপক ক্যান অসগুড বলছেন, ‘এই জোটের (ন্যাটো) মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতা রয়েছেন, যারা পুতিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত। জোট ভাঙতে তিনি এসব নেতাকে ব্যবহার করবেন। এদের মধ্যে রয়েছেন হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।’

এই ছয় বছরে রাশিয়ার কী হবে?
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের সহযোগী ফেলো জন লাফ বলছেন, আগামী ৬ বছর পুতিন ক্ষমতায় থাকার মানে হচ্ছে, রাশিয়া ক্রমে আরও অন্ধকারের দিকে যাবে। বেশির ভাগ রুশের কাছে পুতিন মানে—তাদের বঞ্চিত হওয়ার পথ। আগামী বছরগুলোতে তাঁর কারণে তাঁরা বঞ্চিতই রয়ে যাবেন। এর মানে, তিনি গর্ত খুঁড়ছেন, আর তাতে পড়ছে রুশরা। আর পুতিন আশা করে আছেন, পশ্চিরারা আটকে গেলে তিনি ইউক্রেন কবজা করে নেবেন।

জন লাফ নিউজউইককে বলেন, ‘কিন্তু আমেরিকা যদি ইউরোপ থেকে চলেও যায় এবং ন্যাটোর শক্তি কমে যায়, তাহলেও রাশিয়া এগিয়ে যেতে পারবে না। এই দেশ ক্রমে একা হয়ে যাবে, হয়ে যাবে অকেজো।’

তবে মনে রাখতে হবে, এই ভবিষদ্বাণী কিন্তু হয় পশ্চিমাদের, নয়তো পশ্চিমা চিন্তা–প্রক্রিয়া ও বিশ্ববীক্ষায় আস্থাভাজনদের। এর বিপরীত দিকও কিন্তু আছে। সেটি হলো—ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর ধাপে যে পশ্চিম খুব দ্রুতই এই যুদ্ধে নিজেদের তরফে জয় টেনে আনার সুখকল্পনা করেছিল, তা যে কল্পনাই রয়ে গেছে—তা এখন দিনের আলোর মতোই বাস্তব। শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে এই সময়কালে ইউক্রেনে নিজেদের প্রকাশ্য সেনাপতির ওপর থেকেও তারা আস্থা ও আশা দুইই সরিয়ে ফেলছে।

এর বিপরীতে রাশিয়া চীনের সাথে সঙ্গত করে মুদ্রাবাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত করছে। বড় বড় প্রকল্প শুধু নয়, বিভিন্ন দেশের সাথে মিলে আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক খেলায় নিজেদের হিস্যা বুঝে নিতে এক বলয় তারা সৃষ্টি করতে পেরেছে, যা এমনকি ভবিষ্যৎ পৃথিবীকেও আকার দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে রাশিয়ার ক্রমে একা হয়ে পড়াটা পশ্চিমা স্বপ্ন, যা বাস্তব হতে পারে, নাও পারে। সোজা–সাপটা ভবিষদ্বাণী করাটা এখানে ভীষণ কঠিন।

ইউক্রেনে রুশ হামলা অব্যাহত। ফাইল ছবি: রয়টার্স পুতিনের মনে আর কী আছে
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক মিয়েটেক বোদোসজিনস্কি বলেন, ‘আমার মনে হয় পুতিন চাইছেন না ইউক্রেন পুরো দখলে নিয়ে নিতে। তবে তিনি ফিরতেও পারছেন না। তিনি এখন সমঝোতার চিন্তা করতে পারেন। সেটাই তাঁর জন্য নিরাপদ। এরপর ধীরে ধীরে আরও কর্তৃত্ব বাড়ানোর চিন্তা করছেন তিনি। এমনকি পুতিন ন্যাটোর সঙ্গেও যুদ্ধে জড়াবেন না। এ ছাড়া তথ্যযুদ্ধেও তাঁর এত আগ্রহ নেই।’

এর বাইরে পুতিন নিজের দেশেই তথ্যপ্রবাহ কমাতে চাইবেন। কেননা সমাজে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়ছে। এমনটাই মনে করছেন মিয়েটেক বোদোসজিনস্কি। সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও সিএনএনের বেশ কয়েকটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনেও এই দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

পুতিন ক্ষমতায় আসবেন, আগেই সেটা ঠিক করে রেখেছেন। এখন তাঁর চিন্তা আগামী ৬ বছর দেশের ভেতরে কোনো সমস্যা যাতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা তো রয়েছেই। এর বাইরে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছে যুদ্ধে রুশদের নিহত হওয়া নিয়ে। এগুলো সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। 

একদিকে ইউক্রেন, আরেক দিকে ন্যাটোর চোখ রাঙানি। বিশ্বে নিজেদের প্রভাবও আগের মতো নেই আর। এদিকে দেশের ভেতরে একের পর এক সংকট আসছে। অর্থনীতি নিয়ে রয়েছে পশ্চিমাদের চাপ। এবারের ৬ বছরের ক্ষমতায় এর কোনটি থেকে পুতিন রেহাই পেতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। নাকি তিনি জড়িয়ে যাবেন আরও জটিল কোনো সংকটে? নতুন কোনো যুদ্ধে?