বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় কৌতূহল—সংসদের ভেতরের ভোটগ্রহণটা ঠিক কীভাবে হবে? সাধারণ নির্বাচনের মতো কি গোপন ব্যালট, নাকি অন্য কোনো উপায়ে? আজ আমরা সহজ ভাষায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া জানব।
তফসিল, সময়সূচি ও প্রার্থী তালিকা
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই ভোটগ্রহণ। নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের দক্ষ কর্মকর্তারা নিয়োজিত থাকবেন সংসদ সচিবালয়ের দলের সঙ্গে। এই নির্বাচনে মোট ভোটারসংখ্যা ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য, যার মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনও অন্তর্ভুক্ত। তবে লড়াইটা কিন্তু দ্বিমুখী হতে চলেছে।
একদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে প্রার্থী করা হয়েছে এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদকে। আর অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী দলটির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
কীভাবে দেওয়া হবে ভোট?
এখন আসা যাক মূল প্রশ্নে—সংসদ সদস্যরা কীভাবে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন? নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটের দিন সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষে নিজেদের আসনে বসবেন। এরপর নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা প্রত্যেক সংসদ সদস্যের কাছে গিয়ে সরাসরি ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন। এবারই আসছে সবচেয়ে বড় টুইস্ট। ভোট হতে যাচ্ছে প্রকাশ্য পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, সংসদ সদস্যকে ব্যালট পেপারে তাঁর পছন্দের প্রার্থীর পাশে নিজের পূর্ণ স্বাক্ষর ও বিভক্তি সংখ্যা উল্লেখ করতে হবে। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করা হবে এবং সরাসরি সেখান থেকেই প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে। ভোটদানের পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি টেলিভিশনে দেখানো হবে।
ভোটিং পদ্ধতি প্রকাশ্যে কেন?
১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটের বিধান ছিল। পরবর্তীতে নানা পরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নিয়ম পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। একই সাথে চালু হয় এই প্রকাশ্য ভোটিং ব্যবস্থা। সংসদবিষয়ক গবেষকদের মতে, এই আইনের কারণে ব্যালটে প্রার্থীর নামের পাশাপাশি ভোটারের স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক। এর ফলে কে কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা আর গোপন থাকছে না।
তবে প্রকাশ্যে ভোট হওয়ায় তৈরি হয়েছে এক বড় আইনি প্রশ্ন—কোনো সংসদ সদস্য কি নিজ দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন? দিলে কি তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে?
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও মনে করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না। কেউ যদি দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দেন, তবে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল ঘোষণা করবে।
তবে সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদের মতে—৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে সংসদে উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব বা আইন প্রণয়নে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে পদ যাবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়ন বা স্বাভাবিক কার্যপ্রণালীর অংশ নয়; এটি সংবিধান ও বিশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন দ্বারা পরিচালিত। তাই এখানে দলের বাইরে ভোট দিলেও এমপি পদ বাতিল হওয়ার আইনি সুযোগ নেই।
সংসদের বর্তমান আসনবিন্যাস অনুযায়ী জয়-পরাজয়ের হিসাবটা কিছুটা অনুমেয় হলেও, এই প্রকাশ্য ভোটিং ও সাংবিধানিক আইনি তর্কের কারণে নির্বাচনটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।



