২০২৪ সালটা নির্বাচনের বছর। এরই মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও রাশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ভোট। তবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিধর দুই দেশ ভারত ও আমেরিকায় নির্বাচন এখনো বাকি। এর মধ্যে ভারতে এপ্রিলে শুরু হচ্ছে ভোটগ্রহণ।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে জনপদ—ভারতের সবখানে এখন নির্বাচনের হাওয়া। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একের পর এক সভা করছেন, ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যতম প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় কংগ্রেস কিছুটা চুপসে গেলেও থেমে নেই প্রচারে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ বলা হয় ভারতকে। এবার দেশটিতে মোট সাত দফায় লোকসভা নির্বাচন হবে। প্রথম দফার ভোট হবে আগামী ১৯ এপ্রিল। আর সপ্তম দফার ভোট হবে ১ জুন। ৪ জুন হবে ফল প্রকাশ।
এত বড় আয়োজনের খরচও নিশ্চয় বেশি হওয়ার কথা। দলগুলোও তো দেদারসে টাকা ঢালার কথা। হচ্ছেও তাই। সংবাদমাধ্যম ইকোনোমিস্ট বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনের আয়োজন করতে যাচ্ছে ভারত। অনেকেই মনে করতে পারেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে খরচ বেশি হওয়ার কথা। তাদের অনুমান মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।
ভারতের আগের নির্বাচনগুলোর খরচ কিন্তু সে কথাই বলছে। ২০১৯ সালে সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ভারতে। ওই নির্বাচনের প্রচারে মোট খরচ হয়েছিল আনুমানিক ৮৫০ কোটি মার্কিন ডলার। সে সময় নির্বাচনে এত বেশি খরচ হয়নি আর কোনো দেশে। পরের বছর ২০২০ সালে সেই রেকর্ড ভাঙে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
এবারও আরেকটি রেকর্ডের দিকে যাচ্ছে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। বিশ্লেষকদের ধারণা, এবার এই নির্বাচনে মোট ব্যয় হতে পারে ১ থেকে দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এই রেকর্ড ভাঙতে পারবে কিনা, সেটিই দেখার বিষয়।
এত অর্থের উৎস কী?
লোকসভা নির্বাচনের এসব টাকার একটি বড় অংশ অবৈধ মাধ্যম থেকে আসছে। নগদ এই অর্থ পায় দলগুলো। যারা এই নগদ অর্থ দেন, তাঁদের একটি অংশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত। তবে সম্প্রতি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও ফান্ডিং শুরু করেছে। এরই মধ্যে এই অর্থ নিয়েও শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা।
এই স্কিমের নাম ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’। ২০১৮ সালে ভারতে প্রথম চালু হয় অস্বচ্ছ এই নির্বাচনী বন্ড, যার মাধ্যমে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে ইচ্ছেমতো অর্থ দিতে পারে। সেই অর্থ জমা হয় তহবিলে। শত শত কোটি টাকা এই ‘পলিটিক্যাল ডোনেশন’ থেকে পায় রাজনৈতিক দলগুলো।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষণা দেয়, এই স্কিম অসাংবিধানিক। ওই সময় বন্ডের একমাত্র ইস্যুকারী স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে (এসবিআই) আদালত একটি বিশেষ নির্দেশ দেন। তাতে বলা হয়, কারা বন্ডগুলো কিনেছে এবং কারা কত টাকা পেয়েছে তার বিস্তারিত তথ্য ৬ মার্চের (২০১৮) মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে। আর তথ্য পাওয়ার এক সপ্তাহ পর এগুলো প্রকাশ করতে হবে।
কিন্তু একের পর এক ডেডলাইন পেরিয়ে গেলেও তা প্রকাশ হচ্ছিল না। শেষমেশ গত জুনে ব্যাংক তা মেনে নেয়। সম্প্রতি ভারতীয় নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশ করা হয় বন্ডের বিস্তারিত। তবে এতে কোন রাজনৈতিক দল কার থেকে কত টাকা পেয়েছে, তা জানানো হয়নি। শুধু জানানো হয়, কোন দল কত পেল, আর কারা কত দিল।
ভারতে এই নির্বাচনী বন্ড ভাঙিয়ে সবচেয়ে বেশি আয় করেছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২০১৮ সালে নির্বাচনী বন্ড চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার কোটি রুপি আয় করেছে দলটি। তারপরই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃতীয় স্থানে রয়েছে কংগ্রেস। আর চার নম্বরে রয়েছে কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের দল ভারত রাষ্ট্র সমিতি (বিআরএস)।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, লোকসভা নির্বাচন সামনে রেখে সম্প্রতি বন্ড–সংক্রান্ত নতুন তথ্য প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এতে দেখা যায়, নির্বাচনী বন্ড বিক্রি করে বিজেপি আয় করেছে ৬ হাজার ৯৮৬ কোটি রুপি। এরপর তালিকায় কংগ্রেস নয়, তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলটির আয় হয়েছে ১ হাজার ৩৯৭ কোটি রুপি।
তালিকা থেকে জানা যায়, ভারতের সবচেয়ে পুরোনো দল কংগ্রেসের আয় হয়েছে ১ হাজার ৩৩৪ কোটি রুপি। আর ভারত রাষ্ট্র সমিতির (বিআরএস) আয় ১ হাজার ৩২২ কোটি রুপি।
প্রতিবেদনে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ সরকারি চুক্তির জন্য অপেক্ষমাণ। এ ছাড়া ট্যাক্স ও তদন্ত সংস্থার নজরে পড়া ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও দিয়েছে মোটা অঙ্কের তহবিল। এমনকি কেউ কেউ তাদের লাভের চেয়েও বেশি টাকা দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিলে।
অস্বচ্ছ উৎসে ‘চাঁদাবাজির গ্যাঁড়াকল’
বন্ড ব্যবস্থা চালুর পর থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে কংগ্রেস প্রথম থেকেই এই স্কিমের সমালোচনা করছে। তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে বিজেপি কৌশলে জেনে নিচ্ছে বিরোধী দলগুলোকে কারা তহবিল দিচ্ছে। এরপর সেসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে আনা হচ্ছে বিভিন্ন মামলার আওতায়।
এ কারণে ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী এই স্কিমকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘চাঁদাবাজির গ্যাঁড়াকল’ হিসেবে অভিহিত করেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী বন্ড কিনেছে ফিউচার গেমিং ও হোটেল সার্ভিসেস। চমকে যাওয়ার মতোই তথ্য এটি। তামিলনাড়ুর এই প্রতিষ্ঠান বন্ড কেনে ১৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের। ক্ষমতাসীন ডিএমকে বন্ড বিক্রি করে পায় এর মাত্র ৩৭ শতাংশ। বাকি অর্থ কোথায় গেল? এ নিয়ে থেকে যায় বড় প্রশ্ন।
এ ছাড়া সবচেয়ে বেশি বন্ড কেনা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফ্রাস্টাকচার, এরই মধ্যে যারা সরকারের বিভিন্ন চুক্তিতে নাম লিখিয়েছে। এ তালিকায় আরও আছে খনন কোম্পানি বেদান্ত, ভারতের দ্বিতীয় শীর্ষ টেলিকম প্রতিষ্ঠান ভারতি এয়ারটেল। ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি তহবিল দিয়েছেন ব্রিটেনভিত্তিক ভারতীয় স্টিল ম্যাগনেট লক্ষ্মী মিত্তাল।
কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কোন রাজনৈতিক দলকে কত টাকা দিল, তা না জানতে পারলে এই ব্যবস্থার কোনো মানে নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এখনো চাইলে এই নিয়মে তথ্য প্রকাশ করা যেতে যারে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই) আদালতের কথা মেনে এসব তথ্য প্রকাশ করতে পারে। তবে তা করলে রাজনৈতিক দলগুলো বিপদে পড়ে যাবে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিজেপি।
ভারতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবসায়ীরা তহবিল দিয়ে থাকেন। এই প্রথা নতুন নয়, অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। কিন্তু এদের তথ্য প্রকাশ করলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কেননা তাঁর দলে এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী টাকা দিচ্ছেন, যারা সরকারের অনুকূলে থেকে কয়েক বছরে ফুলেফেঁপে উঠেছেন। নির্বাচনের আগে এসব তথ্য সামনে না আসা মোদির জন্যই ভালো।
সমালোচকেরা বলছে, বন্ডের এই স্কিম রাজনীতিতে অবৈধ অর্থ আসা বন্ধ করতে পারবে না। কেননা এর মাধ্যমে আসলে ভোট কেনা হয়, কেনা হয় প্রতিষ্ঠান ও প্রভাব। তবে যারা এর বিরোধিতা করছেন, তাঁরা এখন পর্যন্ত বিকল্প কোনো পথও বের করে দিতে পারেননি। এ কারণে সরকারও এ নিয়ে এতটা তৎপর নয়। এবারের নির্বাচনে পার পেয়ে গেলে বিজেপি এই ব্যবস্থাকে কোনদিকে নিয়ে যায়, সেটিই দেখার বিষয়।