২০১৬ সালের ঘটনা। কিউবার রাজধানী হাভানায় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মধ্যে অদ্ভুত সব লক্ষণ দেখা যায়। এদের মধ্যে বেশির ভাগেরই মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। কানে হতে থাকে ভোঁ ভোঁ শব্দ। এ ছাড়া অনেকের স্মৃতিশক্তি কমে যেতে থাকে, হতে থাকে বমিভাব। কানে কম শুনতে শুরু করেন কেউ কেউ। এর নামই হাভানা সিনড্রোম, যা নিয়ে এত রহস্য।
প্রথম দিকে মনে হয়েছিল অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে এমন হচ্ছে। কিংবা শারীরিক জটিলতা এর কারণ। কিন্তু পরে জানা গেল ভিন্ন ব্যাপার। যেসব ইলেকট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করা হয়, সেখান থেকে মাইক্রোওয়েভ (তরঙ্গ) আসছে দেহে। আরও পরে বিভিন্ন তদন্তে জানা যায় ভয়াবহ তথ্য। তদন্তে বলা হয়, কোনো গোপন ডিভাইস থেকে এসেছে এসব মাইক্রোওয়েভ, যাতে সরাসরি আক্রান্ত হচ্ছেন কর্মকর্তারা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, অনেক প্রতিবেদনে ২০১৬ সালের কথা বলা হলেও কয়েকটি প্রতিবেদন বলছে তারও দুই বছর আগে প্রথম এই সিনড্রোম দেখা যায় জার্মানিতে।
মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিবেদনেও তেমন আশঙ্কার কথা বলা হয়। তবে এতে সরাসরি রাশিয়াকে অভিযুক্ত করা হয়নি। যেমনটি বাকি প্রতিবেদনে করা হয়েছে।
সম্প্রতি দ্য ইনসাইডার, দের স্পিগেল ও সিবিএসের সিক্সটি মিনিটসের যৌথ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। এতে দাবি করা হচ্ছে, মার্কিন কর্মকর্তাদের টার্গেট করে শব্দতরঙ্গের এই ‘অস্ত্র’ ব্যবহার করে আসছে রাশিয়া। এতে সরাসরি যুক্ত রাশিয়ার গোয়েন্দা বিভাগ।
এবারের প্রতিবেদন বলছে, ২৯১৫৫ নামে পরিচিত রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ এই আক্রমণে সরাসরি যুক্ত। তারা বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহার করে সেখান থেকে ক্ষতিকর তরঙ্গ নিঃসরণ করছে। সেই তরঙ্গ সরাসরি আঘাত হানছে টার্গেট করা ব্যক্তির মস্তিষ্কে। যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের আশপাশে রুশ গোয়েন্দাদের উপস্থিতি ছিল।
যৌথ তদন্তে আরও দাবি করা হয়, এসব কাজে যেসব রুশ গোয়েন্দা জড়িত ছিলেন, তাঁদের পরে পুরস্কৃতও করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি আসলে ‘নন–লিথাল অ্যাকুস্টিক ওয়েপনস’। এটি কোনো দৃশ্যমান অস্ত্র নয়। এর মাধ্যমে মার্কিন কর্মকর্তাদের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে সক্ষম হন রুশ গোয়েন্দারা।
মার্কিন সামরিক কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করা গ্রেগ এডগ্রিন সিবিসির সিক্সটি মিনিটসকে বলেন, যাদের টার্গেট করা হয়, তাঁরা সবাই কোনো না কোনো সময় রুশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। এবং এসব কাজে তাঁরা বেশ এগিয়েছিলেন। তাঁরা এমন সব কাজ করেছিলেন, যাতে রাশিয়ার ক্ষতি হয়।
হাভানা সিনড্রোমে আক্রান্ত এফবিআইয়ের এক এজেন্ট সিবিসির সিক্সটি মিনিটসকে বলেন, ২০২১ সালে ফ্লোরিডায় বসবাসের সময় তাঁর দেহে এসব লক্ষণ দেখা দেয়। কানে এমন শব্দ আসত, মনে হতো ডেন্টিস্ট দাঁত পরিষ্কার করছে। মনে হতো কান পুরো বন্ধ হয়ে গেছে। পরে কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায় তাঁর। এমনকি স্মৃতিও লোপ পেতে থাকে।
এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসনের কাছে জানতে চায় সিবিসি নিউজ। তারা বলছে, হাভানা সিনড্রোম নিয়ে তারা আরও গভীরভাবে কাজ করবে। বিশেষ করে এতে আক্রান্তদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে। তবে এবারও তাঁরা আগের মতো বললেন, এতে বিদেশের কেউ জড়িত নাও থাকতে পারে।
এই সিনড্রোমে আক্রান্তদের মধ্যে হোয়াইট হাউস সিআইএ ও এফবিআই কর্মকর্তারাও রয়েছেন। মোট ১ হাজারের বেশি কর্মকর্তা এতে আক্রান্ত বলে জানা যায়। মার্কিন প্রশাসন আক্রান্তদের সব খরচ দেয়।
হাভানা সিনড্রোমের কারণ হিসেবে শব্দতরঙ্গের আঘাত কিংবা মাইক্রোওয়েভকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। একে মানসিক রোগ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। ২০২০ সালে প্রকাশিত মার্কিন বিজ্ঞান, প্রকৌশলী ও মেডিকেল একাডেমির প্রতিবেদন বলছে, বেতার তরঙ্গের কারণে এমনটি হতে পারে।
নতুন এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে রুশ প্রশাসনের কাছে জানতে চায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ক্রেমলিন সোমবার রয়টার্সকে জানায়, এই অভিযোগ পুরোপুরি অসত্য।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘এটি কিন্তু নতুন কোনো টপিক নয়। কয়েক বছর ধরেই হাভানা সিনড্রোম ব্যাপারটি গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত। প্রথম থেকেই আমাদের দিকে অভিযোগের তির। এর পেছনে কোনো অকাট্য প্রমাণ কিন্তু নেই। এসব আসলে গণমাধ্যমের বানানো।’
হাভানা সিনড্রোম ইস্যুতে রাশিয়াকে বারবার দায়ী করলেও মার্কিন প্রশাসন কখনোই সরাসরি তাদের কথা উল্লেখ করেনি। এমনকি এসব সিনড্রোম প্রকাশের কয়েক বছর পর গণমাধ্যমের চাপে পড়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে বাধ্য হয় এফবিআই। তাতে রাশিয়ার যুক্ত থাকার কোনো আলাপ নেই। এ কারণে এই সিনড্রোম নিয়ে এখনো কাটছে না রহস্য।