দুয়ারে কড়া নাড়ছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ আমেরিকার নির্বাচন। আগামী ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের প্রচারণা বেশ জমে উঠেছে। তবে একই সঙ্গে শঙ্কার মেঘও দানা বাধছে। এই শঙ্কা নির্বাচনী ফল মানা না-মানা নিয়ে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইকনোমিস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে সংঘাত হওয়ার শঙ্কা আছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেই প্রেসিডেন্ট হবে এমন কোনো কথা নেই। অন্যদিকে নভেম্বরে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর কংগ্রেস থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা ও ক্ষমতা গ্রহণে আরও দুই মাস সময় লাগে। সব মিলিয়ে দেশটির জটিল নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও জটিল হতে পারে এবার।
এসব জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে দেশটির গণতন্ত্র মলিন ও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ সাত অর্থনীতির জোট জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা সবচেয়ে কম। অন্যদিকে জোটটির দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের সততা নিয়ে শঙ্কা আছে।
এদিকে গেল ১০ সেপ্টেম্বর রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস প্রথমবার মুখোমুখি বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। দেশটির আসন্ন নির্বাচন যে গভীর সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে সেটির কিছুটা আভাস এতে পাওয়া গেছে।
বিতর্কে ট্রাম্প মিথ্যা ও ভয়াবহ সেই দাবি আবারও করেন। তিনি দাবি করেন, ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল চুরি করা হয়েছিল। ট্রাম্পের এই দাবি তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সত্যি বলে মনে করেন। এখান থেকে স্পষ্ট যে, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দ্বিতীয়বারের মতো সংঘাত দেখা দিতে পারে। পুনরাবৃত্তি হতে পারে ক্যাপিটল হিলের ঘটনার। ট্রাম্প ও তাঁর দল এমন একটি পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইকনোমিস্টের বিশ্লেষণে।
চলমান নির্বাচনী প্রচারণায় উভয় পার্টি বারবার বলছে, তাদের দল হেরে গেলে হুমকিতে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র। তবে নির্বাচনে হেরে গেলে ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এমনকি তাঁর জেল পর্যন্ত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, আসন্ন মার্কিন নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অচলাবস্থা কেমন হতে পারে? ইকনোমিস্টেরে প্রতিবেদনে সম্ভাব্য খারাপ অবস্থার তিনটি দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, কমলা হ্যারিস ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে প্রতিযোগিতা এমন তীব্র হলো যে ফল নির্ধারণের জন্য ইলেকটোরাল কলেজের মধ্যে টাই-ব্রেকিং হতে পারে। উল্লেখ্য, ভোটের অনুপাতে প্রত্যেক অঙ্গরাজ্য থেকে একাধিক ইলেকটোরাল কলেজ মনোনয়ের সুযোগ পায় রাজনৈতিক দলগুলো। এমনটি হলে পরবর্তী ধাপে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভার পড়বে প্রতিনিধি পরিষদের ওপর। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রতিনিধি পরিষদে গেলে ট্রাম্পই নিশ্চিতভাবে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবেন। কারণ নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কিন্তু দেশটির এবারের নির্বাচন এই পর্যায়ের আসার সম্ভাবনা যথেষ্ট কম।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়। এমনটি হলে যেসব সুইং স্টেট বা দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে কমলা হারবেন সেখানে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে পারে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা আসতে পারে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট থেকে। ২০০০ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও আল গোরের বিজয়ের ঘোষণা এসেছিল দেশটির সুপ্রিম কোর্ট থেকে। এমন হলে এবার ২০০০ সালের মতো ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা ও সিনেটরেরা সহজে আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না। জানুয়ারিতে কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দিন তাঁরা ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। ২০২১ সালে ট্রাম্পের দলের আইনপ্রণেতা ও সিনেটরেরা এটি করতে চেয়েছিলেন। তবে এক্ষেত্রে ২০২১ সালের মতো দাঙ্গা হওয়ার শঙ্কা কম। আর শেষ পর্যন্ত কমলার নির্বাচনী ফল মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
তৃতীয়ত, কমলার অবিসংবাদিত জয়। এমনটি হলে যুক্তরাষ্ট্র যে আরেকটি বড় ধরনের সংঘাতে পড়তে যাচ্ছে তা প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ ট্রাম্প শিবির এরই মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রচার করছে তা তখন তাদের বাস্তব বলে মনে হবে। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য কিছু প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে। নির্বাচনী ফল নিয়ে লড়াই করার জন্য দলটি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এরই মধ্যে ১০০টির বেশি মামলা করে রেখেছে। কিন্তু আশার কথা হলো, দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোর রিপাবলিকান পার্টির গভর্নরদের ফল মেনে নেওয়ার মতো মানসিকতা রয়েছে। তাই যেসব আইনজীবী ষড়যন্ত্রের কথা বলে কমলার বিজয়কে চ্যালেঞ্জ করতে চাইবেন তাদের রিপাবলিকান পার্টির গভর্নর রুডি গিয়লিয়ানির মতো ব্যক্তিরা নিবৃত্ত করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যে নানা নাটকীয়তা ও উত্তেজনায় ঠাসা তা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এখন বাকি ধাপগুলো দেখার অপেক্ষা। এসব ধাপ কোন দল কীভাবে উতরাবে সেটিই দেশটির পরবর্তী গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসারিত বা সংকুচিত করবে।