ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বইছে এক নজিরবিহীন জোয়ার। প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোট পড়েছে রেকর্ড ৯৩.১৯ শতাংশ। আর বুধবার দ্বিতীয় দফাতেও সেই হার ৯০ শতাংশ ছোঁয়ার অপেক্ষায়। যেখানে সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের হার সাধারণত ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের এই ৯৩ শতাংশের পেছনে রহস্যটা ঠিক কী? এটি কি পরিবর্তনের ডাক, নাকি টিকে থাকার লড়াই? আজকের আমরা বিশ্লেষণ করব এই রেকর্ড ভোটদানের নেপথ্যে থাকা চারটি প্রধান কারণ।
নাগরিকত্ব নিয়ে আতঙ্ক
রেকর্ড ভোটের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআরকে (SIR)। নির্বাচন কমিশনের এই হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বলা হচ্ছে, এরা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ঘটনা রাজ্যজুড়ে এক ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি করেছে। মানুষ ভয় পাচ্ছে যে যদি তারা এবার ভোট না দেয়, তবে ভবিষ্যতে তারা হয়তো এ দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারবে না। অবস্থা এমন যে ভোটাররা এবার শুধু ভোটই দিচ্ছেন না, বরং প্রমাণ হিসেবে ভোটার স্লিপের ফটোকপিও সংগ্রহে রাখছেন। এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই-ই মানুষকে ঘর থেকে বের করে এনেছে।
পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বনাম সুরক্ষা
রাজনৈতিক তত্ত্বে বলা হয়, মানুষ যখন চরম ক্ষুব্ধ থাকে, তখনই ভোটদানের হার বাড়ে। ২০১১ সালে সিপিআইএমের ৩৪ বছরের শাসনের অবসানের সময়ও রাজ্যে রেকর্ড ভোট পড়েছিল। এবারও কি তেমনই কিছু ঘটতে চলেছে? একদিকে মমতা সরকারের বিরুদ্ধে কর্মসংস্থান ও দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি—বিজেপির মতো বহিরাগত শক্তির হাত থেকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্পগুলো বাঁচাতে ভোটাররা ঐক্যবদ্ধ। অর্থাৎ একপক্ষ ভোট দিচ্ছে পরিবর্তনের আশায়, অন্যপক্ষ দিচ্ছে নিজেদের সামাজিক সুরক্ষা কবজ বাঁচিয়ে রাখতে।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা
এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো আইনশৃঙ্খলা। বিগত নির্বাচনগুলোর মতো এবার এখন পর্যন্ত কোনো বড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। প্রায় ২৩ হাজার কোম্পানির বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করায় ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পেরেছেন। ২০২১ সালের শীতলকুচি ট্র্যাজেডির স্মৃতি মাথায় রেখে কমিশন এবার আকাশপথেও নজরদারি চালিয়েছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তৃণমূল কর্মীদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ করেছেন, তবে সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশই ভোটের হার বাড়াতে সহায়তা করেছে।
ভোটারদের কাছে বুথ
শুধু কড়া নিরাপত্তাই নয়, কমিশন এবার ভোটারদের কাছে বুথ নিয়ে গেছে। বিশেষ করে টালিগঞ্জের মতো অভিজাত এলাকায় আবাসিক ফ্ল্যাটের ভেতরেই বুথের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে যাঁরা সাধারণত রোদে পুড়ে বা ভিড় সামলে ভোট দিতে অনীহা দেখান, তাঁরাও এবার নিজেদের ড্রয়িংরুমের পাশে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
এসআইআর-এর ভয়, অস্তিত্বের সংকট আর পরিবর্তনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। রেকর্ড এই ভোট শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যাবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি নিজের দুর্গ রক্ষা করতে পারবেন, নাকি বিজেপি প্রথমবার ক্ষমতার স্বাদ পাবে? উত্তর মিলবে ভোট গণনার দিন।



