কমলা হ্যারিসকে হারিয়ে ডোনাল্ড ট্রম্প জয়ী হওয়ার পরদিন দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল–‘আমেরিকা একজন স্ট্রংম্যান আমদানি করেছে’। আর ওই প্রতিবেদনের ভেতরে বলা হয়েছে, আমেরিকা এখন এমন একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে, যা ২৪৮ বছরের ইতিহাসে কেউ দেখেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম পলিটিকো লিখেছে, ট্রাম্প প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। তিনি ও তাঁর মিত্ররা শত্রুদের তালিকা করেছেন এবং ওই তালিকা ধরে ধরে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবেন।
এর পর নিউইয়র্কারের প্রধান প্রতিবেদনের ছবিটির কথা বলতেই হয়। ওই প্রতিবেদনে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর রক্তলাল রঙের ট্রাম্পের ‘সিলুয়েট’ (ছায়ার মতো ছবি) ব্যবহার করা হয়েছিল। আর ওই ছবির সঙ্গে প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল–‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিশোধ: সাবেক প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে ফিরবেন আরও কঠোর, আরও বিপজ্জনক হয়ে’।
বেশির ভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরই আশঙ্কা, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনকাল হবে স্বৈরশাসনের কাল। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ক্ষমতায় বসার প্রথম দিন থেকেই ট্রাম্প একজন স্বৈরশাসক হিসেবে আবির্ভূত হবেন।
কিন্তু ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই সব আশঙ্কা ও অভিযোগের উত্তর এই একরোখা শাসক কখনোই দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। বরং তিনি বেশ খোলা মনেই কর্তৃত্ববাদী শাসকদের প্রশংসা করেন এবং তাঁদের মতোই শাসক হতে চান।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি ট্রাম্পের কথাগুলোকে আমলে নেব? তিনি কি সত্যি সত্যিই আমেরিকাকে কর্তৃত্ববাদী পথে নিয়ে যাবেন? নাকি তাঁর সমর্থকদের বিনোদিত করতেই শুধু এসব লাগামহীন কথা বলেন তিনি?
কঠোর শাসকদের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। কেউ গণতান্ত্রিক বাতারণের মধ্যে থেকেও কামান্ডিং স্টাইলে দেশ শাসন করেন। আবার কেউ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নষ্ট করে দমনমূলক প্রদ্ধতিতে দেশ শাসন করেন।
বিপদ মূলত এই দ্বিতীয় শ্রেণির শাসকদের নিয়ে। খ্যাতিমান মার্কিন রাজনীতি‑বিশ্লেষক ল্যারি ডায়মন্ড বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকির বিষয় হচ্ছে, কঠোর শাসকদের হাতে ক্ষমতা যাওয়া। এতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে কাগুজে বাঘে পরিণত হয়–যেমন সংসদ, আদালত, গণমাধ্যম, বিরোধী দল ইত্যাদি। এ ধরনের শাসকের উজ্জ্বল উদাহরণ তুরস্কের রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান। সারা বিশ্বেই অবশ্য এই গোত্রের শাসকদের উপস্থিতি বাড়ছে।
কঠিন‑কঠোর‑কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে ট্রাম্প কত দূর যেতে পারেন, তার খানিকটা আভাস পাওয়া গিয়েছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শাসনকালেই। ফলে দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি যে আরও বল্গাহীন হবেন, সেই আশঙ্কা করাই যায়। এই আশঙ্কার পেছনে অন্তত চারটি কারণ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
প্রথমত: ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রশাসনকে ব্যবহার করতে পারেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যাডাম প্রজেওরস্কি বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার দাপট কম থাকতে হয়। মানুষ যেন এই ভয় না পায় যে, পরাজিতরা সহিংসতা চালাতে পারে কিংবা অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে। অন্যদিকে বিজয়ীদের মনেও এই ভয় থাকতে হবে, যারা পরাজিত হয়েছে, তারা আবার পরের মেয়াদে জয়ী হতে পারে। ফলে বিজয়ীদেরও সংযমী আচরণ করতে হবে।’
কিন্তু ট্রাম্পের মধ্যে এই মৌলিক বোঝাপড়ার বিষয়টি দেখা যায় না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআর এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানিয়েছে, চলতি বছরে নির্বাচনী প্রচারের সময়ে ট্রাম্প তাঁর প্রতিপক্ষদের শায়েস্তা করার জন্য ১০০ বারের বেশি হুমকি দিয়েছেন। তিনি কমলা হ্যারিস সম্পর্কে বলেছিলেন, তাঁকে অভিসংশিত করা উচিত এবং বিচার করা উচিত। জো বাইডেনকে বলেছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রেসিডেন্ট, তাঁর সপরিবারে বিচার করা দরকার। আর লিজ চেনিকে তিনি গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত: যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ। তারা রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে না। রাষ্ট্রের সেবা করাই তাদের প্রধান আদর্শ। আমেরিকায় ‘পোস কমিট্যাটাস’ নামে একটি আইন রয়েছে। আইনটিতে বলা হয়েছে, চরম জরুরি অবস্থা ছাড়া প্রেসিডেন্ট কখনোই অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করতে পারবেন না। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদের শাসনামলে ২০২০ সালে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারের বিক্ষোভকে সহিংসভাবে দমন করতে ‘নিয়মিত ও সক্রিয় দায়িত্বরত’ সেনাদের ব্যবহার করতে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
এসব কারণে এখন ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে নিজের প্রয়োজনে নির্দলীয় সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে পারেন। এর আগেও ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে সেনা মোতায়েনের পক্ষে কথা বলেছেন। যেমন ২০২২ সালে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, শিকাগোর মতো যেসব জায়গায় আইন‑শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, সেসব জায়গায় ন্যাশনাল গার্ডের সৈন্য পাঠিয়ে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা উচিত।
গত এপ্রিলে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের সময় ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি পোস কমিট্যাটাস আইনের লঙ্ঘন করবেন কি না। উত্তরে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের কিছু অসুস্থ মানুষ আছে, উগ্র, বামপন্থী ও পাগল, তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনে ন্যাশনাল গার্ড ব্যবহার করতে হবে।’
ট্রাম্পের এসব বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, তিনি দমনমূলক পদ্ধতিতেই দেশ পরিচালনা করবেন।
তৃতীয়ত: সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা সরকারের ক্ষমতার রশি টেনে ধরে রাখে। ফলে সরকারের ক্ষমতাচর্চায় এক ধরনের ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগেই এসব প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠী আক্রমণের শিকার হয়েছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্টের বুদ্ধিজীবী সাসকিয়া ব্রেচেনমাচার বলেছেন, হাঙ্গেরি, ভারত, তুরস্কসহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া গণতান্ত্রিক দেশে মিডিয়া আউটলেট, ওয়াচডগ গ্রুপ ও অ্যাডভোকেসি সংস্থাগুলোকে মানুষকে ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। ট্রাম্পও সম্ভবত সেই পথেই হাঁটবেন। তিনি গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে নখদন্তহীন করতে জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।
ট্রাম্প এরই মধ্যে সিবিএস, এবিসি এবং এনবিসি চ্যানেলের লাইসেন্স কেড়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ এই সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর সমালোচনা করে সংবাদ প্রচার করেছিল।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার শিক্ষার্থীরা যখন বিক্ষোভ করছিল তখন ট্রাম্প এক সভায় বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে এই ছাত্রদের দেশ থেকে বের করে দিতেন। কারণ বিক্ষোভকারীদের বেশির ভাগ বিদেশি ছাত্র।
চতুর্থত: আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা এমনভাবে সংবিধান রচনা করেছেন, যাতে কোনো একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আদালত অন্যতম।
কিন্তু আদালতের সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক সুপরিচিত। গত চার বছরে তাঁকে বহুবার আদালতের বারান্দায় পা রাখতে হয়েছে। ট্রাম্প কি সেই আদালতের ওপর প্রতিশোধ নেবেন না, যখন তাঁর হাতে সেই ক্ষমতা চলে এসেছে?
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জন রবার্টস, সোনিয়া সোটোমেয়ার এবং প্রয়াত রুথ ব্যাডার গিন্সবার্গকে প্রকাশ্যে অপমান করেছিলেন। ২০১৮ সালে বিচারক জন টিগারকে তিনি ‘ওবামা বিচারক’ বলে তাচ্ছিল্য করেছিলেন।
ট্রাম্প যে একজন কর্তৃত্ববাদী কঠোর শাসক হয়ে উঠবেন, তা এই চারটি লক্ষণ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আমেরিকার জনগণ কি তবে ভোটের মাধ্যমে ‘একজন স্ট্রংম্যান’ আমদানি করল?