শনিবার সকাল থেকে ইরানে যৌথ সামরিক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। হামলার প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার-ইন-চীফ মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরানও। ইসরায়েলে হামলার পাশাপাশি দেশটি হামলা চালাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিগুলোতে।
এই প্রেক্ষপটে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বড় ধরনের সামরিক হামলা এবং পাল্টা হামলায় ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে বিশ্ব কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববাসীর প্রশ্ন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেছে, নাকি আসন্ন?
বিশ্বযুদ্ধ হলো এমন এক বৈশ্বিক সামরিক সংঘাত যেখানে বিশ্বের অধিকাংশ বা প্রধান শক্তিগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধ বলতে সাধারণত ২০ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সংঘটিত দুটি বড় যুদ্ধকেই জানে বিশ্ববাসী।
তবে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন দেশের মধ্যে চলমান শীতল যুদ্ধের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ যুদ্ধেরও সাক্ষী হয়েছে বিশ্ববাসী। চার বছর ধরে চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি যুদ্ধ। পাশাপাশি পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতও চলমান। এদিকে চীনও তাইওয়ানকে নিজের অংশ হিসেবে দাবি করে সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছে। সুদান, সোমালিয়া, নাইজেরিয়ার মতো আফ্রিকার বেশ কিছু অঞ্চলেও সংঘাত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে উঠেছে।
এসব উত্তেজনার সাথে যুক্ত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারী নীতি ও সিদ্ধান্ত। নিজের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে তাঁর আকস্মিক সামরিক শক্তি প্রয়োগ, পাল্টা শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তৈরি তীব্র বাণিজ্য ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব, এবং একতরফা চুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি করছে বলে মনে করেন সমালোচকরা। এদিকে, বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দাবি করছেন ট্রাম্প, তথাপি তাঁর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা ও অস্থিতিশীলতা আরও উসকে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লেও এখনও পূর্ণমাত্রার বৈশ্বিক যুদ্ধ শুরু হয়নি। তবে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ায় সংকটগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্ব পুরোপুরি ধ্বংসের দিকে না গেলেও ইতোমধ্যে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করেছে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক উদ্যোগ, সামরিক সংযম এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে তা আগের দুই যুদ্ধের তুলনায় অনেক ভিন্ন ও ভয়াবহ হতে পারে। বর্তমানে বহু দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, ফলে সংঘাত শুরু হলে মুহূর্তেই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হতে পারে পুরো বিশ্ব। এছাড়া আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতি একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই বড় ধরনের যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে বিশ্বকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় মূলত ইউরোপের জোট রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা, তীব্র জাতীয়তাবাদ এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় প্রথম যুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তির কঠোর শর্ত, অর্থনৈতিক মন্দা এবং জার্মানিতে হিটলারের আগ্রাসী নীতির ফল হিসেবে, যা দ্রুত ইউরোপ ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির ভোটারদের ওপর করা নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। এতে দেখা যায়, নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকি ও ব্যয় নিয়ে জনমনে উদ্বেগ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।



