ঘটনা নতুন না হলেও গত দুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নাম পুরোপুরি ভাইরাল—জেফরি এপস্টেইন। তিনি ছিলেন একজন মার্কিন কোটিপতি ও বিনিয়োগকারী। কিন্তু তাঁর নাম আজ শুধু অর্থ বা বিনিয়োগের সঙ্গে নয়, জড়িয়ে আছে ভয়াবহ যৌন অপরাধ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে।
কে ছিলেন জেফরি এপস্টেইন?
জেফরি এপস্টেইন ১৯৫৩ সালে নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭০-এর দশকে তিনি শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও দ্রুত প্রবেশ করেন অর্থ ও বিনিয়োগের দুনিয়ায়। পরে তিনি নিজেকে ধনীদের সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর ক্লায়েন্ট কারা—এ নিয়ে ছিল দীর্ঘদিনের রহস্য।
অভিযোগ ও গ্রেপ্তার
২০০৫ সালে প্রথমবার এপস্টেইনের বিরুদ্ধে নাবালিকাকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে ফ্লোরিডায়। ২০০৮ সালে তিনি একটি বিতর্কিত ‘প্লি ডিল’-এর মাধ্যমে অল্প সাজা পান, যা পরে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কে ফেডারেল প্রসিকিউটররা আবারও তাঁকে গ্রেপ্তার করেন নাবালিকাদের যৌন পাচারের অভিযোগে। কিন্তু বিচার শুরুর আগেই ২০১৯ সালের আগস্টে নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে এপস্টেইনের মৃত্যু হয়। কর্তৃপক্ষ একে আত্মহত্যা বলে জানালেও তদন্তে কারাগারের গুরুতর নিরাপত্তা ব্যর্থতার কথা উঠে আসে।
বিশ্বের প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ
মার্কিন বিচার বিভাগ (জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট) প্রকাশিত ‘এপস্টেইন ফাইল’ ঘাটলে দেখা যায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
১৯৯০-এর দশকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টেইন সামাজিকভাবে পরিচিত ছিলেন। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো ক্লাবে একাধিক সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁদের একসঙ্গে দেখা গেছে। তবে ২০০৪ সালের পর এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন বলে দাবি করেন ট্রাম্প।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নাম এপস্টেইনের ব্যক্তিগত ফ্লাইট লগে একাধিকবার পাওয়া যায়। তবে ক্লিনটন দাব করেছেন, সফরগুলো ছিল দাতব্য ও মানবিক কাজসংক্রান্ত এবং তিনি এপস্টেইনের কোনো অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
বিশ্বের অন্যতম টেক উদ্যোক্তা ও ধনকুবের বিল গেটস স্বীকার করেন যে তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছিলেন। গেটসের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনা ছিল দাতব্য ও বৈজ্ঞানিক ফান্ডিং নিয়ে। গেটস পরে বলেন, এই সম্পর্ক ছিল একটি ‘ভুল সিদ্ধান্ত’।
তবে উল্লেখ্য যে এঁদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো ধরনের অপরাধের অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এপস্টেইন মামলা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—ক্ষমতাবানদের জন্য কি আইন আলাদা? কীভাবে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি বছরের পর বছর প্রভাবশালীদের সান্নিধ্যে থেকেও ছাড় পেয়ে গেলেন? জেফরি এপস্টেইন কেবল একজন অপরাধী ছিলেন না—তিনি হয়ে উঠেছিলেন ক্ষমতা, অর্থ এবং জবাবদিহির ঊর্ধ্বে এক নাম। তাঁর মৃত্যু অনেক প্রশ্নের উত্তর চিরতরে অজানা করে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্ব এখনো জানতে চায়—কারা জানত, কারা চুপ ছিল আর কারা সত্যিই দায়ী?