২৮ মার্চ, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে লাখো মানুষ একটি সরল কিন্তু শক্তিশালী স্লোগান নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন —‘নো কিংস।’ রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, দেশজুড়ে হাজারো শহরে এই বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়। আন্দোলনটার শুরু ২০২৫ সালে, এরপর থেকে ছড়াতে থাকা এই আন্দোলনে সবচেয়ে বড় সমাবেশ হলো এবারই।
শুধু বড় শহরই নয়, ছোট শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট - আন্দোলনটি আর শুধু লিবারেল বা উদারপন্থী শহরগুলোর ব্যাপার নয়।
তবে আন্দোলনের আকার যত বাড়ছে, ততই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো এই আন্দোলনের দিক নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আন্দোলন যত গড়াচ্ছে, ততই এর স্লোগানে নতুন নতুন লক্ষ্য যোগ হচ্ছে, এর হাত ধরে আন্দোলনটির দিকনির্দেশনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্নও জাগছে।
‘নো কিংস’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
এই স্লোগানটির শিকড় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক পুরোনো ধারণা থেকে পাওয়া যাবে। ধারণাটি হলো —রাজতন্ত্রের প্রত্যাখ্যান। বিশ্লেষণভিত্তিক ওয়েবসাইট দ্য কনভারসেশন–এ বলা হয়েছে, এই স্লোগানটি ইচ্ছা করেই বেছে নেওয়া হয়েছে, কারণ এই স্লোগানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন সেই ধারণার কথা মনে করিয়ে দেয়। কোন ধারণা? ক্ষমতা দায়বদ্ধ থাকবে শুধুই জনগণের কাছে।
২০২৬ সালে বিক্ষোভকারীদের এই স্লোগান ব্যবহারের পেছনে কারণ আছে। তাঁদের যুক্তি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতার সেই সীমা অতিক্রম করছেন — সেটা রাজনৈতিকভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এবং প্রতীকী অর্থে যেভাবেই দেখা হোক না কেন। তাঁদের মতে, একটা নিপীড়নকারী স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করছেন ট্রাম্প।
আন্দোলনের কেন্দ্রে নির্দিষ্ট কেউ নেই
এই আন্দোলনটি পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন অ্যাক্টিভিস্ট সংগঠনের একটি জোড়াতালি দেওয়া জোটের মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে ইনডিভাইজিবল, ফাইভজিরোফাইভজিরোওয়ান মুভমেন্ট এবং জলবায়ু ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলো।
আয়োজকেরা এই আন্দোলনের নেতৃত্বে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপকে রাখেননি। যেন সবাই সহজে ও অবাধে অংশ নিতে পারে, সেদিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। দ্য গার্ডিয়ানে এক সংগঠক বলেন, ‘এটা এমন একটি জোটভিত্তিক মডেল, যেখানে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করা যে কেউই অংশ নিতে পারে।’
এই কাঠামোর কারণে আন্দোলনটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই কাঠামোই আবার আন্দোলনের ভেতরের গ্রুপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় টানাপোড়েনের জায়গা হয়ে ওঠার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সমালোচনা আছে, নিজেদের ভেতরই বিতর্কও আছে
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা একদিকে লাখ ছাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সমালোচনাও বাড়ছে। সমালোচনাটা বাইরে থেকে যেমন, তেমনি ভেতর থেকেও।
১. দাবিহীন আন্দোলন?
সবচেয়ে বড় সমালোচনাগুলোর একটি হলো — এই আন্দোলনের কোনো স্পষ্ট, একক দাবি নেই। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একেক জায়গার বিক্ষোভে একেকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে — কোথাও গাজা ও ইরানে যুদ্ধ, কোথাও গর্ভপাতের অধিকার, তো কোথাও দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়া।
এত ভিন্নতার কারণেই শঙ্কা জেগেছে যে আন্দোলনটি প্রতীকী কিন্তু বাস্তব ফলহীন হয়ে উঠতে পারে। কারণ ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে রাস্তায় নামা একই আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের জন্য জবাব দেওয়া কঠিন – অথবা এভাবে বলা যায় যে, নীতিনির্ধারকদের জন্য এমন আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সহজ।
এমন আন্দোলন দ্রুত ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি থাকে। একজন কৌশল বিশ্লেষক বলেন, ‘যদি হাতের কাছের সবকিছুই অগ্রাধিকার পায়, তাহলে আসলে কোনো কিছুই অগ্রাধিকার পায় না।’
তবে আন্দোলনের সমর্থকদের মতে, এই সমালোচনা যাঁরা করছেন, তাঁরা পুরো বিষয়টি ঠিকভাবে বুঝতে পারছেন না। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ এক সংগঠক বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কোনো একটি নির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা নয়। আমরা এটাই দেখাতে চাই যে, সাধারণ মানুষের কত বড় একটা অংশ সরকারের বিরোধিতা করছে।’
২. নেতৃত্বের সংকট
আগের অনেক আন্দোলনের মতো এখানে কোনো দৃশ্যমান নেতা নেই। এটি ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। এর কিছু সুবিধাও আছে – এমন আন্দোলন সহজে দমন করা কঠিন, এভাবে আন্দোলন সাজালে বিভিন্ন পক্ষের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে, নেতৃত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে স্থানীয়ভাবে সংগঠিত হওয়া সহজ।
তবে এর ফলে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয় — প্রশাসন আলোচনার প্রস্তাব দিলে আন্দোলনকারীদের হয়ে আলোচনা করবে কে?
বিবিসি নিউজ–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ধরনের কাঠামো আন্দোলনের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। কারণ এমন আন্দোলন সরকারকে আইন প্রণয়নে বা পরিবর্তনে বাধ্য করার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে না, আন্দোলনের গতি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পারে না, আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী – সেই বার্তাও একভাবে রাখতে পারে না।
কিছু অ্যাক্টিভিস্টও বিষয়টি স্বীকার করছেন। এক সংগঠক বলেন, ‘আমরা অনেক বড় কিছু তৈরি করে ফেলেছি ঠিকই, কিন্তু এটাকে কীভাবে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দেব সেটা এখনো খুঁজে পাইনি।’
৩. জোটের ভেতরের টানাপোড়েন
এই আন্দোলন অনেকগুলো ইস্যুকে একসঙ্গে ধারণ করছে। ফলে মতবিরোধ থাকাটাই স্বাভাবিক। কী নিয়ে মতবিরোধ, এ ব্যাপারে বিভিন্ন প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলো হলো - বৈদেশিক নীতি (বিশেষ করে ইরান ও গাজা), জলবায়ু বনাম অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী বার্তার ভারসাম্য।
আল জাজিরা-তে এক এক অ্যাক্টিভিস্ট বলেন, ‘এই আন্দোলনের জন্য যে জোট গড়া হয়েছে, সেই জোটটা শক্তিশালী, কিন্তু একই সঙ্গে এটি ভঙ্গুরও। কারণ এখানে অনেক ভিন্ন লড়াই একসঙ্গে করা হচ্ছে।’
৪. নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো — যারা সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরোধিতা আগে থেকেই করে আসছেন তারাই কি শুধু এই আন্দোলনে একজোট হয়েছেন, নাকি এই আন্দোলন নতুন কাউকেও সরকারের বিতর্কিত সব পদক্ষেপের ব্যাপারে সচেতন করে তাদের রাস্তায় নামাতে পেরেছে?
একদিক থেকে এবারের এই আন্দোলন ইতিবাচক পয়েন্ট পাবে, সেটি হলো – এবারের বিক্ষোভে কিছু গ্রামীণ এলাকা, এমনকি কিছু রক্ষণশীল এলাকাতেও মানুষ রাস্তায় নেমেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অংশগ্রহণকারীদের একটা বড় অংশ আগেই বিভিন্ন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কে যুক্ত ছিলেন।
৫. রাজনৈতিক প্রভাব কতটা?
টাইম–এ এক বিশ্লেষক বলেন, ‘বড় সমাবেশ মানেই বড় প্রভাব নয়।’ অর্থাৎ, বিপুল মানুষ রাস্তায় নামা মানেই রাজনৈতিকভাবে মানুষকে প্রভাবিত করা নয়।
সরকারের প্রতিক্রিয়া কী
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া তা-ই ছিল, যে প্রতিক্রিয়া সাধারণত যেকোনো সরকার তার বিরুদ্ধে ওঠা আন্দোলনের ক্ষেত্রে দেখায় — বিক্ষোভকে ছোট করে দেখা এবং এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
রয়টার্স–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই বিক্ষোভকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রচার করছেন। একজন মুখপাত্র বলেন, ‘এই বিক্ষোভগুলো পক্ষপাতদুষ্ট এবং এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে না।’
দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসন এগুলোকে ‘অ্যাক্টিভিস্টদের অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে দেখছে।
এসব বিক্ষোভের কারণে কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়নি সরকার। এতে বোঝা যায়, তারা বিষয়টিকে মোকাবিলা করার বদলে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল নিচ্ছে।
এরপর কী? গতি কোন দিকে, ফলাফল কী আসবে?
এখন মূল প্রশ্ন হলো — এই আন্দোলন কি শুধু বিক্ষোভেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে? অনেক সংগঠকই এই আন্দোলনকে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত করছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস–এ এক সংগঠক বলেন, ‘এটা শুধু মিছিল নয় — মানুষকে ভোট দিতে উৎসাহিত করারও বিষয়।’
কিন্তু আগের আন্দোলনগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় আকারের বিক্ষোভ ভোটারদের ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে, তবে এর কারণেই যে নির্বাচনের ফল বদলে যাবে, এমনটা সব সময় বলা যায় না।
গতি ধরে রাখাও এমন বড় বিক্ষোভের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বিবিসি নিউজ-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এমন আন্দোলনের ক্ষেত্রে কোনো একদিন একটি বড় সমাবেশ হলে এরপর সাধারণত অংশগ্রহণ কমে যায়, আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করতে হয়।
এই লক্ষ্যেই কিছু সংগঠক এখন আন্দোলনটিকে কমিউনিটি পর্যায়ে সংগঠিত রাখার পরিকল্পনা করছেন। পাশাপাশি ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম ও নিয়মিত বিক্ষোভের পরিকল্পনাও আছে তাঁদের।
মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে বিক্ষিপ্ত এমন আন্দোলনের নীতিগত প্রভাব শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এখন পর্যন্ত আগের বিক্ষোভগুলো থেকে সরাসরি কোনো বড় নীতিগত পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে এমন আন্দোলনের পরোক্ষ প্রভাবও হেলায় এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। গণমাধ্যমে আন্দোলনের ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা চলে, আইনপ্রণেতাদের ওপর চাপ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের ভেতরের বিতর্কেও প্রভাব ফেলে।
আল জাজিরা-তে এক বিশ্লেষক বলেন, ‘এই ধরনের আন্দোলনের কারণে সঙ্গে সঙ্গেই নীতিতে বদল আসে না। কিন্তু এমন আন্দোলন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ বদলে দিতে পারে।’
সামনে দুই ঝুঁকি: উত্তেজনা জমবে নাকি ক্লান্তি জেঁকে ধরবে
এখন আন্দোলনের সামনে দুটি বিপরীত ঝুঁকি রয়েছে। এক, উত্তেজনা বাড়তে থাকা - কিন্তু এক্ষেত্রে বিক্ষোভ বাড়লে সংঘাত বাড়তে পারে, রাজনৈতিক বিভাজনও আরও তীব্র হতে পারে। দুই, ক্লান্তি - স্পষ্ট ফল না এলে মানুষ আগ্রহ হারাতে পারে, ফলে গণমাধ্যমের মনোযোগ কমে যেতে পারে।
দ্য কনভারসেশন–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের জন্য শুধু ক্ষোভ নয়, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং অর্জনযোগ্য কিছু লক্ষ্যও সামনে নিয়ে আসা প্রয়োজন।’
এই আন্দোলনের গুরুত্ব কতটা?
নো কিংস আন্দোলন দেখাচ্ছে, ২১শ শতকে আন্দোলনের ধরন কীভাবে বদলাচ্ছে। এসব আন্দোলনে কেন্দ্রে নির্দিষ্ট নেতা নেই, কিন্তু নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়াচ্ছে; কোনো একক ইস্যুর বদলে মূল্যবোধভিত্তিক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের মনে।
লাখো মানুষকে রাস্তায় নামাতে সক্ষম হওয়া নিঃসন্দেহে এই আন্দোলনের বড় সাফল্য। তবে সেই শক্তিকে স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়া যাবে কি না — তা এখনো অনিশ্চিত।
নো কিংস আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় নাগরিক সমাবেশ, কিন্তু একই সঙ্গে সবচেয়ে জটিলও। আকারের দিক থেকে এই আন্দোলন শক্তিশালী, বার্তায় নমনীয়, কিন্তু এর ফলাফল অনিশ্চিত। আন্দোলনটি এখন নতুন এক পর্যায়ে ঢুকতে যাচ্ছে। সে কারণে প্রশ্নটি এখন আরও স্পষ্ট - যে আন্দোলন ক্ষমতার বিরোধিতা করে, সেটি কি আন্দোলনের নিজের ক্ষমতাকেই ব্যবহার করার বুদ্ধিটা শিখতে পারবে?