এয়ারবাসকে দূরে ঠেলে কেন বোয়িংয়ে ফিরল বিমান?

৩৫ হাজার কোটি টাকা বা ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন, তার ইতিহাসে অন্যতম বড় বিনিয়োগে সাক্ষী হলো গতকাল বৃহস্পতিবার। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আমেরিকান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে কিনতে যাচ্ছে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ। কিন্তু যেখানে এয়ারবাস কেনার জোরালো আলোচনা ছিল, সেখানে হুট করে কেন বোয়িং? এই বিশাল বিনিয়োগ কি শুধুই ব্যবসায়িক, নাকি এর পেছনে রয়েছে বড় কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ?  

কী কিনছে বিমান?

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সই হওয়া এই চুক্তির আওতায় বিমান বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ১৪টি উড়োজাহাজ কিনবে। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। ড্রিমলাইনারগুলো ব্যবহার করা হবে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দূরপাল্লার রুটে। আর ৭৩৭ ম্যাক্সগুলো ডানা মেলবে আঞ্চলিক ও স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে। বর্তমানে বিমানের বহরে বোয়িংয়ের তৈরি ১৬টি উড়োজাহাজ থাকলেও, এই নতুন সংযোজন বহরের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

এয়ারবাস বনাম বোয়িং: কেন এই ইউ-টার্ন?

গল্পের শুরুটা কিন্তু অন্যরকম ছিল। ২০২৩ সালে ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার একটি সমঝোতা সই করেছিল তৎকালীন সরকার। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঢাকা সফরের সময় এয়ারবাসের দিকেই পাল্লা ভারী ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দৃশ্যপট বদলে যায়। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি আলোচনায় আসে। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক লড়াইয়ে এয়ারবাসকে পেছনে ফেলে শেষ হাসি হাসল বোয়িং। বিমানের এই সিদ্ধান্ত কি টেকনিক্যাল নাকি পলিটিক্যাল?

অনেক বিশেষজ্ঞই এই চুক্তিকে দেখছেন ভিন্ন চোখে। কারও কারও মতে এটি নিছকই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাদের মতে, আমেরিকার বাড়তি ট্যারিফ মোকাবিলা বা কূটনৈতিক সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতেই এ সিদান্ত হতে পারে। আর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যেহতু বিমান আগে থেকেই বোয়িং দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে তাই বহরে বোয়িং এলেই সুবিধা বেশি। 

শুধু তাই নয়, প্রশ্ন উঠেছে বোয়িংয়ের নিরাপত্তা নিয়েও। সম্প্রতি ৭৩৭ ম্যাক্স এবং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা সমালোচনা চলছে। গত বছরের ১২ জুন এয়ার ইন্ডিয়ার একটি দুর্ঘটনার পর ড্রিমলাইনারের মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

রুট বনাম লোকসান

সক্ষমতা বাড়লেই কি বিমানের ভাগ্য বদলাবে? বর্তমান বহরে লং-হউল বা দূরপাল্লার উড়োজাহাজ থাকলেও বিমান তার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি জাপানের নারিতা রুটটি চালু করার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় স্থগিত করা হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, মাসে ২০ কোটি টাকা লোকসান গুনছে এই রুট। অবশ্য আবারও রুটটিতে ফ্লাইট শুরুর কথা জানিয়েছে বিমান। অন্যদিকে টরন্টো ও রোম ফ্লাইটের লাভ-ক্ষতি নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো যখন বাংলাদেশের আকাশপথের ৭৫ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন পরিকল্পনাহীন বহর বাড়ানো লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি ডেকে আনতে পারে।

১৪টি নতুন উড়োজাহাজ আসা মানেই সেবার মান বাড়বে– এমনটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এই বিশাল বিনিয়োগ দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের জন্য একটি বড় বাঁক। এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক এই ডিল শেষ পর্যন্ত বিমানের ব্যবসায়িক কাঠামোকে কতটা শক্তিশালী করে, নাকি লোকসানি রুটের তালিকায় আরও নতুন নাম যুক্ত হয়।