গত মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের সময় রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক। পাকিস্তানের দাবি, চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান দিয়ে তারা ভারতের রাফাল ভূপাতিত করেছে। ভারত যদিও তা স্বীকার করেনি।
এখন আবার জে-১০সি যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশে। কারণ, এ মাসের শুরুর দিকে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, চীন থেকে ২২০ কোটি ডলার ব্যয়ে ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জে-১০সিই হচ্ছে জে-১০সি বিমানের রপ্তানিযোগ্য সংস্করণ।
এর পর স্বাভাবিকভাবেই দুই ধরনের যুদ্ধবিমানের পার্থক্য নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে অনেকের মনে। তা রাফাল আর জে-১০সি-এর মধ্যে পার্থক্য কোন কোন জায়গায়?
দুটির মিল আগে বলে নেওয়া যাক। দুটিই ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ, এফ-২২, এফ-৩৫, জে-২০-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের চেয়ে রাফাল বা জে-১০সি-র রাডারে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বা ঝুঁকি বেশি। তবে রাফাল বা জে-১০সি-র রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি, সেন্সর চতুর্থ প্রজন্মের, অর্থাৎ এফ-১৬, মিগ-২৯-এর মতো যুদ্ধবিমানের চেয়ে বেশি উন্নত ও আধুনিক। দুটিই মাল্টিরোল ফাইটার, অর্থাৎ আকাশে থাকা অবস্থায় আকাশ কিংবা মাটি—দুই জায়গারই শত্রুপক্ষের স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে।
এবার পার্থক্যের দিকে নজর দেওয়া যাক।
ইঞ্জিনে পার্থক্যের কথাই সবার আগে আলোচনায় আসবে। ডেসল্টএভিয়েশন ডট কম জানাচ্ছে, রাফাল টুইন-ইঞ্জিনের, জে-১০সি একক ইঞ্জিনের। এর প্রভাবটা কী? দ্বৈত ইঞ্জিন থাকায় একটা ইঞ্জিনে আঘাত লাগলেও অন্য ইঞ্জিনের মাধ্যমে রাফাল ফিরে আসতে পারবে। অন্যদিকে একক ইঞ্জিনের কারণে জে-১০সি-র দাম কম, কিন্তু সেই ইঞ্জিন আঘাতপ্রাপ্ত হলে বিমানটা ঝুঁকিতে পড়বে।
দ্বিতীয়ত, দুই যুদ্ধবিমানের ভারবহনের ক্ষমতায় পার্থক্য আছে। ডেসল্টএভিয়েশনই জানাচ্ছে, ম্যাক্সিমাম টেক-অফ ওয়েট বলতে যা বোঝানো হয়, অর্থাৎ রানওয়ে ছাড়ার সময়ে বিমানটা কত ওজন বহন করতে পারবে তার সর্বোচ্চ সীমা রাফালের বেশি। জে-১০সি-র সর্বোচ্চ বহন ক্ষমতা ১৯ টনের কাছাকাছি, রাফালে সেটা প্রায় সাড়ে ২৪ টন।
ধারণক্ষমতা বেশি বা কম হলে কী হয়? রাফাল বেশি তেল বহন করতে পারবে, যা দিয়ে জে-১০সি-র চেয়ে দূরবর্তী স্থানে হামলা করা এই বিমানের পক্ষে সম্ভব। বা রাফালে জে-১০সি-র চেয়ে সংখ্যায় বা ওজনে বেশি অস্ত্র নেওয়া যাবে।
এর পর আসতে পারে কমব্যাট রেডিয়াস, অর্থাৎ রিফুয়েলিং-এর প্রয়োজন ছাড়াই একটা প্লেন কত দূর যেতে পারে, গিয়ে মিশন শেষ করে আবার ফিরেও আসতে পারে। সে বিচারেও কিছুটা এগিয়ে রাফাল। জে-১০সি-কে শর্ট টু মিডিয়াম রেঞ্জ লড়াইয়ের উপযোগী বলা হয়, যেখানে রাফালকে ধরে নেওয়া হয় লং রেঞ্জ লড়াইয়ের উপযোগী।
যে মিসাইল ব্যবহৃত হয় ফাইটার প্লেনে, তার পারফরম্যান্স কী সেটাও তো গুরুত্বপূর্ণ। মিসাইলের ধরন দুই ফাইটার জেটে কী চিত্র তুলে ধরছে?
জে-১০সি-তে সাধারণত চীনের তৈরি পিএল-১৫ ও পিএল সিরিজের আরও কিছু এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে পিএল-১৫ একটি অ্যাকটিভ রাডার মিসাইল, অর্থাৎ মিসাইলের ভেতরে স্বয়ংক্রিয় রাডার নিজেই চালু হয়ে যায় এবং নিজেই লক্ষ্যবস্তুকে 'লক' করে নিয়ে আঘাত করতে পারে। কোনো পাইলটের সাহায্যের দরকার পড়ে না। লং রেঞ্জের এই মিসাইলগুলো অনেক দূরে, অর্থাৎ মানুষের খালি চোখে দেখা যায় না এমন লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে। এ দুই কারণেই জে-১০সি-কে আঞ্চলিক যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় বলে জানাচ্ছে দ্য ওয়ার জোন ওয়েবসাইট।
আর রাফাল? এটিও বিভিআর রাডার, অর্থাৎ দৃষ্টিসীমার অনেক দূরে আঘাত হানতে পারে, এমন মিসাইল ব্যবহার করে। ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা দেশে তৈরি মিসাইলের পাশাপাশি এতে এয়ার-টু-গ্রাউন্ড হামলা করার মতো অস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল আর সমুদ্রে হামলা চালানোর মতো অস্ত্র সংযুক্ত করার ব্যবস্থাও আছে।
সেন্সর আর রাডার কেমন? জে-১০সি-তে এএসইএ রাডার থাকে—অত্যাধুনিক এই রাডার দ্রুত স্ক্যান তো করেই, একবারে অনেক লক্ষ্যবস্তুর অবস্থানও তুলে ধরতে পারে। পাশাপাশি চীনের অত্যাধুনিক এভিয়নিক্স সুইটসও আছে। দ্য ওয়ার জোন বলছে, এই অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক সিস্টেম বা সুইট, যা মূলত একটা ফাইটার জেটের দেখা, ভাবা ও লড়াই করার সবকিছুই দ্রুততর করছে, এর সঙ্গে অত্যাধুনিক সেন্সরের উপস্থিতি জে-১০সি-কে আগের চীনা ফাইটার জেটগুলোর তুলনায় রণক্ষেত্রে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলছে।
রাফালে সেন্সর সুইটটা সমন্বিত, এতে আছে স্পেকট্রা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম। রাডারও আধুনিক।
রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার আর সফটওয়্যার কতটা আধুনিক, নির্ভুল ও ক্ষিপ্র, তার ওপর নির্ভর করে একজন পাইলট কত দ্রুত শত্রুপক্ষকে খুঁজে পাবে, নিজের রাডারে ধরা পড়া এড়াবে, মিসাইল থেকে বাঁচবে বা প্রতিপক্ষের নেটওয়ার্ক জ্যাম করবে। ডেসল্টএভিয়েশন ডট কমের মতে, বিশ্লেষকরা সাধারণত রাফালের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারকে বিশ্বের সেরাদের একটি বলে থাকেন।
এর বাইরে প্লেনে ট্যাঙ্ক বা অস্ত্র সংযুক্ত করার 'হার্ডপয়েন্ট' রাফালে জে-১০সি-র চেয়ে বেশি। যুদ্ধক্ষেত্রেও রাফালের ব্যবহার এখন পর্যন্ত বেশি হয়েছে। লিবিয়া, সিরিয়া, আফ্রিকায় রাফাল কাজে লাগানো হয়েছে, তুলনায় জে-১০সি ইদানীং কিছু কিছু সমরে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তা এত পার্থক্য যখন হিসাব করা হলো, এক বাক্যে কি বলা যায় যে, একটি রাফাল আর জে-১০সি মুখোমুখি হলে কে জিতবে? দ্য ওয়ার জোন, ডেসল্টএভিয়েশনের মতো ওয়েবসাইটগুলো বলছে, পরিষ্কার আবহাওয়ায়, ভালো কৌশল অবলম্বন করতে পারলে রাফাল এগিয়ে না থাকার কোনো কারণ নেই। কিন্তু জে-১০সি যদি পিএল-১৫ মিসাইল নিয়ে নামে এবং ভালো কৌশল দেখাতে পারে, তাহলে সেটিও লম্বা সময় ধরে রাফালকে অনেক দূর থেকেও ভোগাতে পারবে।
তবে একটা জায়গায় জে-১০সি নিরঙ্কুশ ব্যবধানে এগিয়ে, তা হলো দামে। যারা পশ্চিমা জেট বিমান কিনতে পারেন না বা চান না, তাদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জে-১০সি।
এভিয়েশন বিষয়ক ওয়েবসাইট অ্যারো টাইম বলছে, একটি রাফালের বেস-ফ্লাইঅ্যাওয়ে দাম ৮০ থেকে ১২৫ মিলিয়ন ডলার। তবে বিমানের কনফিগারেশন ও সুযোগ-সুবিধা ভেদে দাম আরও বাড়তে পারে। ২০১৬ সালে ভারত ৩৬টি রাফাল কিনতে ফ্রান্সের সঙ্গে ৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ইউরো চুক্তি করেছিল। এ হিসেবে প্রতিটির দাম পড়েছিল প্রায় ২০০ থেকে ২২০ মিলিয়ন।
এ দিক দিয়ে অবশ্য জে-১০সি বেশ সস্তা। ডিফেন্স মিরর বলছে, এর একটি ইউনিটের বেস-ফ্লাইঅ্যাওয়ে দাম হতে পারে ৪০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার।


ভারতের রাফায়েল ধ্বংস করা যুদ্ধবিমানই কি কিনছে বাংলাদেশ?
পশ্চিমা উদ্বেগের মধ্যেই রাশিয়ার কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কিনল ইরান
তুরস্কের নতুন চমক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান আনকা-৩
