রেলের ১০০ টাকা আয়ে ব্যয় ১৯১ টাকা!

জ্বালানির চড়া দাম, পুরোনো ইঞ্জিন, দিন দিন বাড়তে থাকা পরিচালনা খরচ—আর এসবের মাঝে বছর বছর শত শত কোটি টাকার লোকসান। বাংলাদেশ রেলওয়ের নাম শুনলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে এক চির-লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ছবি। কিন্তু পরিস্থিতি কি কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে? রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, গত অর্থবছরে তাদের আয় বেড়েছে ২২১ কোটি টাকারও বেশি। তাহলে কি লোকসানের বৃত্ত ভেঙে সত্যি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আমাদের ট্রেন? নাকি এই আয়ের হিসাবের পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো বাস্তবতা? রেলওয়ে কি আসলেই লাভে ফিরছে, নাকি লোকসানের খাতায় শুধু নতুন রং উঠছে?

কত আয়, ব্যয় কত?

সবার আগে চোখ রাখা যাক হিসাবের খাতায়। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেলওয়ে মোট আয় করেছে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই আয় ছিল ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। সহজ হিসাবে, এক বছরে রেলের আয় বেড়েছে প্রায় ২২১ কোটি টাকা বা প্রায় ১২ শতাংশ।

এই আয় বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে মূলত তিনটি খাত:

    যাত্রী পরিবহন: শুধু টিকিট বিক্রি থেকেই আয় বেড়েছে ২৫৬ কোটি টাকা। অনলাইন টিকিট বিক্রির প্রভাব আর তদারকি বাড়ানোর ফলেই এসেছে এই সাফল্য।

    অপটিক্যাল ফাইবার: রেলের ফাইবার লিজ দিয়ে বাড়তি আয় হয়েছে সাড়ে ১১ কোটি টাকা।

    জমি ব্যবস্থাপনা: জমি থেকে রেলের আয় বেড়েছে আরও ৩ কোটি টাকা।

আয়ের চেয়ে ব্যয়ের দৌড় কতদূর?

আয় তো বাড়ল ২২১ কোটি টাকা, কিন্তু পরিচালনা করতে গিয়ে রেল কত টাকা খরচ করেছে? একই অর্থবছরে রেলের পরিচালন ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ সোজা হিসাব—আয় ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, ব্যয় ৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা এবং মোট লোকসান ১ হাজার ৮৮৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

একদিকে আয় বেড়েছে ২২১ কোটি টাকা, অন্যদিকে মোট ব্যয়ের ধাক্কায় বছরের শেষে এসে লোকসানের অঙ্কটা দাঁড়াল প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। তবে আশার কথা হলো—রেলের আয় ও ব্যয়ের অনুপাত আগের চেয়ে কিছুটা ভালো হয়েছে। আগের বছর প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে গিয়ে খরচ হতো ২০৯ টাকা। এবার সেই খরচ কমে হয়েছে ১৯১ টাকা। অর্থাৎ ব্যয়ের লাগাম টানার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

রেল কি আসলেই ব্যর্থ?

রেল কর্তৃপক্ষ অবশ্য পুরোপুরি ব্যর্থতার অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের যুক্তি মূলত দুটি:

১. পেনশনের বিপুল চাপ: রেলের পরিচালন ব্যয়ের ভেতরেই ধরা হয় প্রাক্তন কর্মচারীদের পেনশন, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এটি একটি সামাজিক নিরাপত্তামূলক খরচ। একে পরিচালন ব্যয়ে না রাখলে রেলের আসল ঘাটতি দাঁড়ায় ৮৮৮ কোটি টাকা।
২. ভাড়া না বাড়া: ২০১৬ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত ট্রেন টিকিট থেকে ১ টাকাও ভাড়া বাড়ানো হয়নি। অথচ এই ১০ বছরে জ্বালানির দাম বেড়েছে, ডলারের দর বাড়ায় বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আনার খরচ বেড়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও বেড়েছে। বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রেন ভাড়া বাড়ালে এই লোকসান অনেকটাই কমে আসত বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

আসল ধাক্কাটা কোথায়?

বিশ্বজুড়ে উন্নত রেল ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়—কোনো দেশই শুধু যাত্রী পরিবহন করে রেলে লাভ করতে পারে না। রেলের আয়ের মূল চালিকাশক্তি হলো পণ্য বা মালামাল পরিবহন। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র উল্টো। গত অর্থবছরে ইঞ্জিনের তীব্র সংকটের কারণে পণ্য পরিবহন খাত থেকে রেলের আয় বাড়ার বদলে উল্টো ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা কমে গেছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক বিভিন্ন লাইসেন্স ও অন্যান্য খাত থেকে আয় কমেছে প্রায় সাড়ে ২৪ কোটি টাকা। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেবল ইঞ্জিনের অভাব আর সময়মতো সার্ভিস দিতে না পারায় লাভজনক এই পণ্য পরিবহন খাতে পিছিয়ে পড়ছে রেল।

সমাধান কোন পথে?

একটি রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থা হিসেবে জনকল্যাণই রেলের মূল লক্ষ্য, কেবল ব্যবসা নয়। তবে লোকসান কমাতে হলে রেলকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতেই হবে:

    পণ্য পরিবহনে নজর: নতুন ইঞ্জিন যুক্ত করে দ্রুত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা জোরদার করা।

    ভাড়ার সামঞ্জস্য: সেবার মান বাড়িয়ে ধাপে ধাপে ভাড়ার হার পুনর্নির্ধারণ।

    অনলাইন ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন: টিকিটের কালোবাজারি বন্ধ করা এবং ফাঁকা পড়ে থাকা বিপুল জমি বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো।

সীমাবদ্ধতা অনেক, তবে সম্ভাবনাও কম নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনা আর প্রশাসনিক তদারকি থাকলে লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে রেলকে কার্যকর গণপরিবহনে রূপান্তর করা সম্ভব।