পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। এ প্রস্তাবে সম্প্রতি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হবে ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি ব্যাংক। ব্যাংকটি পরিচালিত হবে বাণিজ্যিকভাবে ও পেশাদারির ভিত্তিতে।
যে পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে নতুন ব্যাংক গঠিত হবে সেগুলো হলো: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। তবে এ পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হলে আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন কি না, কিংবা ব্যাংকগুলোর কর্মীদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও নীতিনির্ধারকেরা জানিয়েছেন, একীভূত হওয়া কোনো ব্যাংকের কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা হবে না। একই সঙ্গে কোনো গ্রাহক তার আমানত হারাবেন না। বর্তমান আইনে শুধু ব্যাংক অবসায়ন হলে আমানতকারীরা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পান। এখন দেশে কোনো ব্যাংক অবসায়ন বা বন্ধ হচ্ছে না। তাই আইনটি সংশোধন করে ব্যাংক একীভূত হলেও টাকা ফেরত দেওয়ার বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতের ক্ষেত্রে গ্যারান্টির পরিমাণ ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করে ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়িত বা বন্ধ হলে প্রত্যেক আমানতকারী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন। ২০০০ সালের ‘ব্যাংক আমানত বীমা আইন’ সংশোধন করে এই ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ প্রণয়ন করা হয়েছে। আগের আইনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতের ক্ষেত্রে কোনো গ্যারান্টি ছিল না, এবার তা রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সুরক্ষিত আমানতের দাবির নিষ্পত্তি সময়সীমা ১৮০ কার্যদিবস থেকে কমিয়ে ১৭ কার্যদিবসে আনা হবে।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “আগে ব্যাংকে আমানতে এক লাখ টাকার গ্যারান্টি ছিল। এখন সেটাকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। ১৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ব্যাংকে আমানত রেখেছেন। নতুন অধ্যাদেশের ফলে প্রায় ৯৩ শতাংশ গ্রাহক সুরক্ষা পাবেন।”
আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি আমানতকারীরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবেন। ব্যাংক একীভূত কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২ লাখ টাকার কম যাদের আমানত, তারা আগে টাকা ফেরত পাবেন। তারা একবারেই পুরো টাকা তোলার সুযোগ পাবেন। আর যাদের ২ লাখ টাকার বেশি আছে, তাদের টাকা ফেরত পেতে অপেক্ষা করতে হবে। তাদের নতুন ব্যাংকের শেয়ার দেওয়ার প্রস্তাব করা হবে। ২০ শতাংশ আমানতকে শেয়ারে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের পর সরকারি তহবিল জোগান দেওয়া হলেই এসব আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
আর্থিক খাত বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোনো ব্যাংক বন্ধ বা অবসায়ন হলে বড় আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের জন্য পরবর্তীতে প্রয়োজনে ব্যাংকটির সম্পদ বিক্রির মাধ্যমেও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত নতুন ব্যাংকের ৪০ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে পরিশোধিত মূলধন হিসেবে আনুমানিক ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত নতুন ব্যাংকটির মূলধন বিষয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেইল-ইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকার আমানত মূলধনে রূপান্তর করা যেতে পারে। বাকি ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে দেবে সরকার।
আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশটিতে ছয়টি অধ্যায় ও ৩৩টি ধারা রয়েছে। অধ্যাদেশে আমানত সুরক্ষা তহবিল (ব্যাংক কোম্পানি) ও আমানত সুরক্ষা তহবিল (ফাইন্যান্স কোম্পানি) নামের দুটি আলাদা তহবিলের বিধান রাখা হয়েছে। তহবিল দুটি পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ড থাকবে। আমানত সুরক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে আমানত সুরক্ষা বিভাগ নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করা যাবে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র হবে।
বিদ্যমান লাইসেন্সধারী ও নতুন লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ২০২৮ সালের ১ জুলাই থেকে এ অধ্যাদেশের অধীন সদস্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরা হবে এবং ২০২৮ সালের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের প্রাথমিক প্রিমিয়াম জমা দিতে হবে।
শুরুতেই প্রিমিয়াম হবে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ অথবা ট্রাস্টি বোর্ড নির্ধারিত পরিমাণ। তবে তা কোনোভাবেই পরিশোধিত মূলধনের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশের কম হবে না। আমানতকারীদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে ব্যাংক কোম্পানি ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর রেজল্যুশনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তহবিলের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশি মুনাফা অর্জনের চেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র, বৈচিত্র্য ও তহবিলের তারল্য সংরক্ষণকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। আমানতের গ্যারান্টির সর্বোচ্চ সীমা প্রতি তিন বছরে কমপক্ষে একবার ট্রাস্টি বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী পুনঃনির্ধারণ করার বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত আমানত দেড় লাখ কোটি টাকা, যার বিপরীতে তাদের প্রদত্ত ঋণ ছাড়িয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। আমানতের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা) ব্যক্তি আমানতকারীদের এবং বাকি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের।
সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কী হবে?
একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, তবে একীভূত হওয়ার পর সেগুলো ডিলিস্ট করা হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে বলা আছে, অবসায়ন বা একীভূতকরণের ক্ষেত্রে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী নন। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে। ডিলিস্টিং প্রক্রিয়া ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈঠক করবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিল হবে, আর একীভূত নতুন ব্যাংকের জন্য নতুন লাইসেন্স দেওয়া হবে।
তবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা এরই মধ্যে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন—পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের দাম ১০ টাকা ফেস ভ্যালুর বিপরীতে ৫ টাকারও নিচে নেমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত আমানত গত মে মাসে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকায় নেমেছে। আর ব্যাংকগুলোর ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ।


একীভূত হচ্ছে ৫ ইসলামী ব্যাংক: সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা
