গত কয়েক মাসে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছিল একটি মাত্র নাম—মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। চাঁদা না পেয়ে প্রকাশ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাসী দিয়ে অফিস ভাঙচুর ও লুটপাট—সবই হয়েছে তার এক ইশারায়। অবশেষে বুধবার সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কিন্তু কে এই ডেভিড ইমন? কীভাবে একজন সাধারণ কৃষকের সন্তান মাত্র দুই বছরে হয়ে উঠলেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের আতঙ্ক?
অপরাধ জগতে উত্থান
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খাতাতেও ডেভিড ইমন নামের কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর অস্তিত্ব ছিল না। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের এক সাধারণ কৃষক মো. মুসার ঘরে জন্ম ইমনের। গ্রামের সাধারণ পরিবেশেই বেড়ে ওঠা। পড়াশোনায় বেশিদূর এগোতে পারেননি। খুব অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়েন স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে। তবে ইমনের লক্ষ্য ছিল অনেক উঁচুতে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সে যোগাযোগ গড়ে তোলে বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের সঙ্গে। একের পর এক দুর্ধর্ষ ও সহিংস অপরাধ ঘটিয়ে খুব দ্রুতই সে বড় সাজ্জাদের নজর কাড়ে। সাজ্জাদ গ্রুপের ক্যাডার ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর সেই সুযোগটাই নেয় ইমন। চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকার অপারেশনের দায়িত্ব চলে আসে তার হাতে। মাত্র দুই বছরেই সে হয়ে ওঠে সাজ্জাদ বাহিনীর প্রধান অপারেশনাল হেড বা সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী প্রায় অর্ধশতাধিক তরুণের এক দুর্ধর্ষ শুটার বাহিনী।
রক্তভেজা দুই বছর
বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারী—এই এলাকাগুলোতে ইমন বাহিনীর আধিপত্য ছিল অত্যন্ত শক্ত। প্রতিপক্ষকে দমানো আর ভয় ছড়াতে শুরু হয় হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিক খেলা। পুলিশের নথি বলছে, গত দুই বছরে অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি নাম উঠে এসেছে এই ডেভিড ইমনের।
এর মধ্যে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামের দুজনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় বহুল আলোচিত জোড়া খুন এবং ২০২৫ সালের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী 'ঢাকাইয়া আকবর' হত্যা উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে ইমনের ভয় ও প্রভাব দুটোই জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।
চন্দনপুরার সেই ভয়াল হামলা
তবে ইমনের প্রধান আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায় প্রযুক্তিনির্ভর চাঁদাবাজি। বিদেশে বসে বা আত্মগোপনে থেকে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা ছিল তার মূল হাতিয়ার।
সম্প্রতি চন্দনপুরার ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। ইমন ডিডিএন মালিকের কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সময় বেঁধে দেওয়া হয় মাত্র দুই দিন। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেয়ে গত সোমবার বিদেশে বসে ইমনের নির্দেশে চকবাজার, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট ও রাউজান থেকে মাত্র ৫০০ টাকা করে হাজিরায় ৩০ জন তরুণকে ভাড়া করা হয়। দুপুরে অ্যাম্বুলেন্স ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে মুখ ঢাকা ৩০ জন সন্ত্রাসী একযোগে হামলা চালায় ডিডিএন অফিসে। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও অফিসের আসবাবপত্র। তারা পরিচালক ও অফিস থেকে নগদ প্রায় ৩৫ লাখ টাকা লুট করে সটকে পড়ে।
এরপর অক্সিজেন, মুরাদপুর ও বায়েজিদ এলাকার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে নীরবে টাকা দিতে বাধ্য হন। গত এক মাসেই এই খাত থেকে ইমন বাহিনী আদায় করে নেয় প্রায় দেড় কোটি টাকা। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক হয় যে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন সংবাদ সম্মেলন করে পুরো ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশন
ডিডিএন অফিসে হামলার অডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পরপরই নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চকবাজার থানায় মামলা দায়েরের পর মাঠে নামে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) ও র্যাব-৭। র্যাব সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল সমন্বয়কারী রোহেন মিয়া ওরফে মাইকেলসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। জব্দ করা হয় হামলায় ব্যবহৃত সেই অ্যাম্বুলেন্সটিও। পরে গ্রেপ্তার করা হয় ইমনের আরও ২২ সহযোগীকে।
এদিকে বুধবার চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার সময় যশোর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইমনকে। যশোর জেলার পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে চালানো অভিযানে অবশেষে পুলিশের খাঁচায় ধরা পড়ে চট্টগ্রামের এই নতুন আতঙ্ক।
কৃষক পরিবারের সন্তান থেকে দ্রুত ধনী হওয়ার লোভ, কিশোর গ্যাং থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হওয়া—ডেভিড ইমনের এই উত্থান যতটা দ্রুত ছিল, পতন হলো তার চেয়েও মারাত্মকভাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই পদক্ষেপে আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, সাজ্জাদ বাহিনীর বাকি সদস্যরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত কি চট্টগ্রামের এই আতঙ্ক পুরোপুরি বন্ধ হবে?