যে দাবিতে টালমাটাল হয়ে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ, যে আন্দোলনের জেরে পতন ঘটেছিল শেখ হাসিনা সরকারের—সেই সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার আন্দোলনের বয়স আজ দুই বছর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে রক্ত আর প্রতিবাদের ওপর দাঁড়িয়ে এই নতুন বাংলাদেশের জন্ম, সেই কোটা সমস্যার কি আসলেই কোনো স্থায়ী সমাধান হয়েছে? বর্তমানে কোটা সংস্কারের আসল অবস্থা কী, আর কারাই বা এখনো বঞ্চিত বোধ করছেন?
বর্তমান কোটা কাঠামো
জুলাইয়ের সেই তুমুল আন্দোলনের পর আদালতের রায় এবং পরবর্তী সময়ে প্রজ্ঞাপনে সরকারি চাকরিতে কোটার একটি নতুন রূপ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সরকারি চাকরির মোট ৯৩ শতাংশ পদই পূরণ করা হয় সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে। বাকি ৭ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে বিভিন্ন কোটার জন্য। এর মধ্যে ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের জন্য, ১ শতাংশ বরাদ্দ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য, আর ১ শতাংশ সংরক্ষিত প্রতিবন্ধী এবং হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর জন্য।
এই ৭ শতাংশের কোটা কাঠামোর কোথাও নারীদের জন্য আলাদা কোনো কোটা রাখা হয়নি। আর এখান থেকেই তৈরি হয়েছে নতুন অসন্তোষ।
রিভিউ কমিটির স্থবিরতা
কোটা সম্পর্কিত অসন্তোষ ও বিষয়গুলো পর্যালোচনার জন্য গত ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ একটি ১১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির দায়িত্ব ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়া। তবে সে কমিটির কাজ এখন থমকে আছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের রেগুলেশন উইংয়ের বর্তমান অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তফা জামান ইংরেজি সংবাদমাধ্যম নিউএজকে জানিয়েছেন, তিনি এই কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নন।
বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ যাদের
কোটা কমিয়ে ৭ শতাংশে নিয়ে আসায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নারী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে। মহিলা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের হিসাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মোট ১৪ লাখ ৪৩ হাজার কর্মীর মধ্যে নারী মাত্র ২৮ শতাংশ। আর জেলা বা বিভাগীয় অফিসের দশম থেকে দ্বাদশ গ্রেডে নারীদের উপস্থিতি প্রায় ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে জাতীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের দাবি, সর্বশেষ বিসিএস পরীক্ষায় পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী থেকে মাত্র চারজন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে সুযোগ পেয়েছেন। অতীতে এই সংখ্যা ছিল ১০ থেকে ২০ জন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা মনে করেন, নারী ও আদিবাসীদের জন্য একটি যৌক্তিক কোটা থাকা প্রয়োজন ছিল, যা মোট ১০ শতাংশের সীমার মধ্যে রাখা যেত। সংগঠনের আরেকজন সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার জানান, সুবিধাবঞ্চিত নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়সংগত ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি হলেও এই বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
কোটা ব্যবস্থার পটভূমি
১৯৭২ সালের ৫ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও ১০ শতাংশ নারী কোটা দিয়ে এই ব্যবস্থার সূচনা হয়। সময়ের ব্যবধানে তা মোট ৫৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। ২০১৮ সালে আন্দোলনের মুখে সরকার সর্বসাধারণের জন্য কোটা প্রথা বাতিল করলেও ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্ট ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার রায় দেন। এর সূত্র ধরেই সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ কোটার নিয়মই কার্যকর রয়েছে।
আন্দোলনপরবর্তী সময়ে প্রান্তিক নারী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও অধিকারকর্মীদের মতে, একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন কি না—সে প্রশ্নটি রয়েই গেছে।