অফিসে নেই কর্মকর্তা-কর্মচারী। অথচ হাজিরা ঠিকই দেওয়া হয়ে গেছে। ভূমি অফিসে এমন সুযোগ বন্ধ করতে এবার চালু হয়েছে নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা– ‘ভূমিদৃষ্টি’।
জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তিনির্ভর এই মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাবে, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে আছেন কি না। শুধু হাজিরা নয়, ছুটির আবেদন, অফিসের বাইরে সরকারি কাজে যাওয়ার তথ্য এবং অবস্থানও থাকবে এই ব্যবস্থার আওতায়।
কিন্তু কীভাবে কাজ করবে ‘ভূমিদৃষ্টি’? ভুয়া হাজিরাই বা কীভাবে ঠেকাবে এই অ্যাপ? আর প্রশাসনিক পর্যায়ে এর মাধ্যমে কী ধরনের তদারকি করা যাবে?
জিও-ফেন্সিং যেভাবে কাজ করবে
‘ভূমিদৃষ্টি’র মূল প্রযুক্তি জিও-ফেন্সিং। সহজভাবে বললে, প্রতিটি ভূমি অফিসের চারপাশে নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের একটি অদৃশ্য সীমানা তৈরি থাকবে।
কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মোবাইল ফোন ওই সীমানার ভেতরে থাকলেই অ্যাপে হাজিরা দেওয়ার সুযোগ সক্রিয় হবে। সীমানার বাইরে অবস্থান করে উপস্থিতি নিবন্ধন করা যাবে না।
কর্মদিবসের শুরুতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেক-ইন করবেন। কাজ শেষে করবেন চেক-আউট। ফলে কর্মস্থলে উপস্থিতি ও কর্মদিবস শেষ করার তথ্য একই ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে।
আর এই পুরো ব্যবস্থা চলবে সাধারণ স্মার্টফোন ও বিদ্যমান মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। অর্থাৎ প্রতিটি অফিসে আলাদা কোনো যন্ত্র বসানো বা সেটি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে না।
নতুন কোনো ভূমি অফিসকে ব্যবস্থার আওতায় আনতে শুধু তার নির্ধারিত সীমানা যুক্ত করলেই হবে। ফলে পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন কার্যালয় যুক্ত করার ক্ষেত্রে বাড়তি অবকাঠামোর প্রয়োজন হবে না।
কেন দরকার এই ব্যবস্থা?
নাগরিক নির্দিষ্ট ভূমি অফিসে গিয়েই ভূমিসেবা গ্রহণ করেন। তাই সেবাদানকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্ট অফিসে উপস্থিত থাকা সেবা দেওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত।
কিন্তু ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ভূমি কার্যালয়গুলো সরেজমিনে নিয়মিত তদারকি করা সহজ নয়। ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে অবস্থানভিত্তিক যাচাই করা গেলে এই তদারকি আরও সহজ হবে।
অর্থাৎ কোনো কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতির তথ্য পেতে সব সময় সরেজমিনে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। অবস্থানভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে তদারকির সুযোগ তৈরি হবে।
অফিসের বাইরে গেলে কী হবে?
তবে সরকারি কাজে অফিসের বাইরে গেলেই কাউকে অনুপস্থিত দেখানো হবে না। তদন্ত, সভা, মাঠপর্যায়ের কাজ কিংবা অন্য কোনো দাপ্তরিক দায়িত্বে বাইরে যেতে হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অ্যাপের ‘সাইট ভিজিট’ অপশন ব্যবহার করতে পারবেন। সেখানে বাইরে যাওয়ার কারণ জানানো যাবে।
অর্থাৎ অফিসে উপস্থিতির তথ্য এবং অনুমোদিত দাপ্তরিক প্রস্থানের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় রাখা হবে।
অন্যদিকে অনুমোদিত কারণ ছাড়া অফিস চলাকালীন কর্মস্থল ত্যাগ করলে সেই তথ্য তদারকি ব্যবস্থায় দেখা যাবে। এমনকি ভুয়া অবস্থান ব্যবহার করে হাজিরা দেওয়ার চেষ্টা, নির্ধারিত সীমানা লঙ্ঘন, অনিবন্ধিত ডিভাইস ব্যবহার কিংবা চেক-আউট না করার মতো ঘটনায় স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা তৈরি হবে।
শুধু হাজিরা নয়, ছুটিও থাকবে অ্যাপে
‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপে শুধু উপস্থিতি নয়, ছুটির ব্যবস্থাপনাও থাকছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অ্যাপের মাধ্যমে ছুটির আবেদন করতে পারবেন। আবেদন, অনুমোদন এবং অবশিষ্ট ছুটির হিসাবও উপস্থিতির তথ্যের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হবে।
ফলে উপস্থিতি ও ছুটিসংক্রান্ত তথ্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থায় না রেখে একই প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ ও তদারকি করা সম্ভব হবে।
কর্তৃপক্ষ কী দেখতে পারবেন?
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য থাকছে মোবাইল অ্যাপ। আর মন্ত্রণালয় ও মাঠপর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জন্য থাকছে প্রশাসনিক প্যানেল।
এই প্যানেল থেকে দৈনিক উপস্থিতি, বিলম্ব, অনুপস্থিতি ও ছুটির তথ্য দেখা যাবে। বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের তথ্য দেখে তদারকি ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
প্রশাসনিক প্যানেল সাধারণ পর্যবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, পরিচালন, তথ্য বিশ্লেষণ ও সিস্টেম সেটিংস এই পাঁচটি ভাগে বিন্যস্ত। এখান থেকে কার্যালয়ের সীমানা নির্ধারণ, সাইট ভিজিট ও ছুটি ব্যবস্থাপনা, উপস্থিতি পর্যালোচনা, সতর্কবার্তা নিষ্পত্তি এবং দৈনিক ও মাসিক প্রতিবেদন তৈরির সুবিধা থাকবে।
উপস্থিতি নিবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গেই তথ্য প্রশাসনিক প্যানেলে দেখা যাবে। ফলে কাগজে প্রতিবেদন তৈরি করে পাঠানোর প্রয়োজনও কমবে।
প্রথম ধাপে ছয় জেলা
তবে শুরুতেই সারাদেশে চালু হচ্ছে না ‘ভূমিদৃষ্টি’। প্রথম ধাপে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম– এই ছয় জেলায় চলছে পাইলট কার্যক্রম।
এই ছয় জেলার ৬১০টি ভূমি কার্যালয়ের ৯১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এর আওতায় আনা হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে ব্যবস্থাটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ও উন্নয়ন করা হবে।
পাইলট কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার পর পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ‘ভূমিদৃষ্টি’র আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই অ্যাপের কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে প্যারালাক্সলজিক ইনফোটেক বা পিএলএক্স।
ভূমিসেবা নিতে একজন নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে অফিসে আছেন কি না এবং সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত কি না। ‘ভূমিদৃষ্টি’ সেই উপস্থিতি ও তদারকিকে প্রযুক্তিনির্ভর করার একটি উদ্যোগ। এখন পাইলট কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এটি কীভাবে ধাপে ধাপে সারাদেশে বিস্তৃত হয়, সেটিই দেখার বিষয়।



