শিক্ষাঙ্গনে হঠাৎ এই অস্থিরতার কারণ কী?

গত দুই–তিন দিন ধরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ফের অশান্ত। প্রশ্ন উঠেছে, আবারও ফিরছে পুরোনো সেই দলীয় সংঘাত? কেন একই সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন? আজ আমরা আলোচনা করব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই অস্থিরতা আসলে কী বার্তা দিচ্ছে?

যেভাবে শুরু হলো সংঘাত

ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার সন্ধ্যায়। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির আয়োজন করেছিল 'জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই' নামের একটি প্রদর্শনী। গোলমালের শুরু সেখানে থাকা 'জুডিশিয়াল কিলিং' নামের একটি ব্যানার নিয়ে। এতে ছিল যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন নেতার ছবি। ছাত্রদল ব্যানারটি সরানোর দাবি জানালে শুরু হয় বাক্‌বিতণ্ডা। পরে এটি গড়ায় চেয়ার ছোড়াছুড়ি এবং দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায়।

রাত ১০টার পর এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের বাইরেও। দুই পক্ষের এই সংঘাতে আহত হন অন্তত ২৫ জন। পরিস্থিতি এমন অবস্থা তৈরি করে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংঘাত এড়াতে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করে।

ঢাকায় এক দিনে ৩ সংঘর্ষ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনার জের কাটতে না কাটতেই পরের দিন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সংঘাতের জেরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ জকসুর ভিপিকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। আহত হন প্রায় ৩০ জন। সহিংসতার আরেক রূপ দেখা যায় ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আহতরা এখানে চিকিৎসা নিতে গেলে ফের তাঁদের ওপর হামলা হয়। এ ঘটনার জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করে শিবির।

তবে জবি ছাত্রদলের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, আবাসন সংকট নিরসনে শিক্ষার্থীদের দাবির বিরুদ্ধে গিয়ে শিবির ক্যাম্পাসে মব তৈরি করতে চেয়েছিল এবং জকসুর একাংশ দখল করে রেখেছিল, যার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিরোধ করেছে। ঘটনা তদন্তে ইতিমধ্যেই চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জবি প্রশাসন।

জগন্নাথের খবর ছড়াতেই সেই উত্তাপ গিয়ে পড়ে ঢাকা কলেজে। শুরু হয় ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে তুমুল মারামারি। এতেও প্রায় ২০ জন আহত হন। ছাত্রদলের দাবি—তাদের কর্মীসভায় বহিরাগত এনে হামলা করেছে শিবির। অন্যদিকে শিবিরের দাবি—তাদের পূর্বঘোষিত দোয়া মাহফিলে হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল।

ঠিক একই সময়ে পুরান ঢাকার সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সামনেও রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। এতে মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষও আহত হন। বুধবারও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজধানীর তিতুমীর কলেজে সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল ও শিবির।

কেন এই অস্থিরতা?

একই দিনে দেশের প্রধান প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া কি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? জুলাই গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল দখলদারি, টেন্ডারবাজি এবং সন্ত্রাসী রাজনীতির চিরঅবসান। কিন্তু বর্তমানে কী দেখা যাচ্ছে?

বর্তমানে ক্যাম্পাসগুলো হয়ে উঠেছে একদলীয় আধিপত্যের পর শূন্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। সব দলই এখানে নিজেদের প্রাধান্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। এ ছাড়া সামনে উঠে আসছে হল ও ছাত্রসংসদকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। মূল রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। ফলে ক্যাম্পাসগুলোও হয়ে উঠছে অশান্ত।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো হাসপাতালে ঢুকে আহতদের ওপর হামলা। এ ঘটনাই প্রমাণ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সহনশীলতার চর্চা কতটা নিচে নেমে গেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেখানে আবাসন ও শিক্ষার পরিবেশ চায়, সেখানে ছাত্রসংগঠনগুলো জড়িয়ে পড়ছে কাদা ছোড়াছুড়ি আর সংঘর্ষে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই মুখোমুখি অবস্থান আর সংঘাত যদি এখনই না থামানো যায়, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বপ্ন চরম হুমকির মুখে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি পারবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে? নাকি রাজনৈতিক দলের প্রভাবেই চাপা পড়ে যাবে এই সহিংসতা?