রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগেই দলকে বিদায় জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশের রাজনীতিতে এমন আবেগঘন বিদায় সচরাচর দেখা যায় না। রাষ্ট্রপতির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে তিনি কি রাজনীতিতে আর ফিরছেন না? নাকি বঙ্গভবনে পদার্পণের মাধ্যমেই শেষ হলো তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার? আজ আমরা দেখব, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে আসা রাজনীতিকদের ক্যারিয়ার কীভাবে বদলেছে। আর মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রেই বা কী হতে পারে?
আবেগঘন বিদায়
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগের রাতে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় দেওয়া বিদায়ী বক্তব্যে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন মির্জা ফখরুল। দলে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের কথা উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। এমনকি দায়িত্ব পালনের সময় ভুলভ্রান্তির জন্য সবার কাছে ক্ষমাও চেয়ে নেন এই জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক। একই সঙ্গে তিনি জানান, বঙ্গভবনে যাওয়ার পর সহকর্মীদের মিস করবেন তিনি। সভায় তিনি মাত্র কয়েক মিনিট বক্তব্য দিয়েছেন, এর মধ্যে চার থেকে পাঁচবার আবেগাপ্লুত হয়ে যান তিনি। একই সঙ্গে সভায় বিএনপি প্রধান ও অন্যদেরও আবেগাপ্লুত করেন। দেশের ইতিহাসে এমন বিদায় অত্যন্ত বিরল।
সেই রাতেই ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে মির্জা ফখরুল লেখেন, ‘আজকে শেষবারের মতো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ বলে বিদায় নিচ্ছি। আপনাদের বিশ্বস্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।’ এর আগে নির্বাচনের প্রচারের সময়ও মির্জা ফখরুল জানিয়েছিলেন, এটিই তাঁর শেষ নির্বাচন। সব মিলিয়ে তাঁর বক্তব্য ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে মনে হতে পারে, হয়তো দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানছেন তিনি।
রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের পথচলা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মির্জা ফখরুল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে শিক্ষকতা করেন এবং সরকারি চাকরিতেও ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকের দিকে ফেরেন সক্রিয় রাজনীতিতে। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে নির্বাচিত হন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে তিনি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। আর ২০১৬ সালে হন বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গিয়েছেন। কঠিন বৈরী পরিবেশে অনেকটা নিজ হাতেই দলের গুরুভার সামলেছেন তিনি। এই সময়টাই তাঁকে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত করে। রাজপথের রাজনীতি থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর রাজনীতিতে ফেরা যায়?
বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্রপতি হওয়া মানেই রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ নয়। তবে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে ফিরে আসার নজির খুব বেশি নেই। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি পদে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মুহম্মদুল্লাহ ও খন্দকার মোশতাক আহমদ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব সামলেছেন। তবে তাঁদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক পরিণতি ছিল ভিন্ন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর দলীয় রাজনীতির কাঠামো গড়ে তোলেন।
আর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রথমে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৯০ সালের প্রবল গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন। তবে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কিন্তু শেষ হয়নি। রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পরও তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবেও আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তবে দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় ২০০২ সালে তিনি পদ ছাড়েন। এর পর ২০০৪ সালে বিকল্পধারা বাংলাদেশ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। অবশ্য তাঁর গড়া দলটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হতে পারেনি।
মো. জিল্লুর রহমান ও মো. আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁদের কেউই রাজনীতিতে সক্রিয় হননি। অর্থাৎ দলীয় রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার পর সেখানেই রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি টানার নজিরও বাংলাদেশের ইতিহাসে রয়েছে।
মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রে কী হতে পারে?
আইনগতভাবে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মির্জা ফখরুলের দলীয় রাজনীতিতে ফেরার পথ বন্ধ– এমন কোনো সাধারণ সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির প্রশ্নটি ভিন্ন। মির্জা ফখরুলের বয়স এখন ৭৮ বছর। রাষ্ট্রপতির পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করলে তাঁর বয়স দাঁড়াবে ৮৩। এত দীর্ঘ সময় পর সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে ফেরার আগ্রহ বা সক্ষমতা থাকবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। এর পাশাপাশি তখন দলীয় নেতৃত্বের চিত্র কী হবে, দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন থাকবে এবং তিনি নিজে রাজনীতিতে ফিরতে চাইবেন কি না– এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই এখনই বলা যায় না যে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ। বরং বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্রপতি পদ কোনো রাজনীতিকের ক্যারিয়ারের স্বয়ংক্রিয় সমাপ্তি নয়। আবার রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে রাজপথে ফিরে আসাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব সাধারণ ঘটনা নয়– এটি বরং ব্যতিক্রম। তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নেবেন, তার উত্তর মিলবে আরও পাঁচ বছর পর।



