রাশিয়ার একের পর এক শক্তিশালী হামলা, আর ইউক্রেনের আকাশে চারদিকে সতর্কসংকেত। সাম্প্রতিক সময়ে কিয়েভের আকাশে দেখা যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব উদ্বেগের দৃশ্য। রাশিয়ার ছোড়া একের পর এক ব্যালিস্টিক মিসাইল আঘাত হানছে ইউক্রেনের মূল কেন্দ্রগুলোতে, আর ইউক্রেনের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই মিসাইলগুলোকে ঠেকাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে।
এক সপ্তাহে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের দিকে ধেয়ে আসা ২৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও ধ্বংস করতে পারেনি ইউক্রেন। কিন্তু কেন এমনটা ঘটছে? এটি কি ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর দুর্বলতা, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে বিশ্ব রাজনীতির আরও বড় কোনো সামরিক সংকট? চলুন সেই আলোচনাতেই যাওয়া যাক।
ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের তীব্র সংকট
যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করতে ইউক্রেনের প্রধান ভরসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিখ্যাত ‘পেট্রিওট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম’। পেট্রিওটের কাজ হলো, আকাশে ধেয়ে আসা ক্ষিপ্রগতির ব্যালিস্টিক মিসাইলকে তার গতিপথেই আঘাত করে ধ্বংস করা।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ইউক্রেনের কাছে এখন পেট্রিওট সিস্টেম থাকলেও, তা থেকে ছোঁড়ার মতো যথেষ্ট পরিমাণ ‘ইন্টারসেপ্টর মিসাইল’ নেই । সামরিক পরিভাষায় একে বলা হচ্ছে, গ্যারেজে ল্যাম্বরগিনি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাতে কোনো জ্বালানি বা তেল নেই।
মার্কিন অস্ত্রাগারে ঘাটতি ও বৈশ্বিক চাপ
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোর মিত্ররা ইউক্রেনকে আরও বেশি করে প্যাট্রিয়ট মিসাইল সরবরাহ করছে না কেন। এর মূল কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রাগার বা স্টকেও এখন মিসাইলের তীব্র সংকট চলছে। বিশ্বজুড়ে একই সাথে কয়েকটি বড় যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটনকে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট ও মিসাইলের ব্যবহার ভাগ করে দিতে হচ্ছে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের সুরক্ষায় বিপুল পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রাখতে হচ্ছে। ফলে ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত ‘সাপ্লাই চেইন’ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আর ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল উৎপাদন যে গতিতে হচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানে চাহিদা তার চেয়ে বহুগুণ বেশি।
রাশিয়ার নতুন সামরিক কৌশল
ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে রাশিয়া। মস্কো তাদের হামলার কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। তারা প্রথমে একসাথে প্রচুর পরিমাণ সস্তা ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল ছুঁড়ছে, যাতে ইউক্রেনীয় রাডার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর পরপরই ছুঁড়ছে প্রচণ্ড গতির 'ইস্কান্দার-এম' বা উন্নত ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
উচ্চপ্রযুক্তির এই ব্যালাস্টিক মিসাইলগুলো শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর মিসাইল না থাকায় ইউক্রেন এখন বাধ্য হয়ে বেছে বেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় মিসাইল ব্যবহার করছে। এর ফলে এমনকি রাজধানী কিয়েভের বেশিরভাগ এলাকা ও অবকাঠামো অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
তাহলে ইউক্রেনের সামনে বিকল্প পথ কী?
ইউক্রেন এখন দুটি বিকল্প নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে। প্রথমটি হলো আকাশে মিসাইল ঠেকানোর বদলে রাশিয়ার ভেতরে যেখানে এই মিসাইল লঞ্চারগুলো রাখা আছে, সেখানেই আগাম হামলা চালানো।
আর দ্বিতীয়টি হলো, ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তায় নিজস্ব মিসাইল উৎপাদন বাড়ানো। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরির অনুমতি দিবে কিনা, সে প্রশ্নটিও বড় হয়ে উঠেছে। তবে নতুন মিসাইল উৎপাদন অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ একটি বিষয়।
এখন বাস্তবতা হচ্ছে, আসন্ন শীতের আগে যদি ইউক্রেন পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সরবরাহ না পায়, তবে তাদের শহরের বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। কিয়েভের আকাশে এই প্রতিরোধহীন অবস্থা কেবল ইউক্রেনের একার সংকট নয়; এটি বিশ্বজুড়ে অস্ত্র উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক সামরিক ভারসাম্যের এক জটিল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন দেখার বিষয়, ইউক্রেনের মিসাইল সংকটের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয়।