সারাদেশে ৫০ লাখের বেশি, আর শুধু ঢাকাতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এতদিন এগুলো বন্ধ করতে গিয়ে চরম আন্দোলন আর বিশৃঙ্খলার মুখে পড়েছে সরকার। কারণ, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ মানুষের রুটি-রুজি। কিন্তু এবার কি সত্যি লাগাম টানা হচ্ছে এসব অবৈধ রিকশার? অটোরিকশা নিয়ে সরকারের নতুন নীতিমালায় ঠিক কী কী পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
৮ জোনে ৮ রঙ, বাধ্যতামূলক সৌরবিদ্যুৎ
সোমবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সচিবালয়ে একটি বড় ঘোষণা দিয়েছেন। এতদিন যেসব রিকশা অবৈধভাবে চলছিল, সেগুলোকে এবার সরাসরি সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ঢাকার বিশৃঙ্খলা থামাতে পুরো ঢাকাকে মোট আটটি জোনে ভাগ করা হবে। আর সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো—এই আটটি জোনের জন্য থাকবে আট ভিন্ন রঙের ই-রিকশা। এক জোনের রিকশা কোনোভাবেই অন্য জোনে যেতে পারবে না। যদি যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে নেওয়া হবে আইনি ব্যবস্থা।
তবে এখানেই শেষ নয়। নতুন নীতিমালায় আরেকটি কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে—তা হলো সৌরবিদ্যুৎ। চালক বা মালিকদের এই ই-রিকশাগুলো চার্জ দিতে হবে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে। যদি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার না করা হয়, তবে নতুন নিবন্ধন তো মিলবেই না, এমনকি পুরোনো নিবন্ধনও নবায়ন করা হবে না। শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এই নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে।
নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক
এতদিন যে কেউ বাজার থেকে একটা ব্যাটারি রিকশা কিনে রাস্তায় নেমে পড়তে পারত। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’। নতুন এই খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নিবন্ধন ও নম্বর নিতে হবে। যিনি রিকশা চালাবেন, তাঁকেও নিতে হবে ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং কোনো এলাকায় কতগুলো রিকশা চলবে, তা ঠিক করবে স্থানীয় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি।
রিকশার সংখ্যা ও গতিসীমা
ব্যবসা করার নামে একজন মানুষ কি শত শত রিকশা কিনে রাস্তায় নামিয়ে দিতে পারবে? উত্তর হলো—না। নীতিমালায় মালিকানার ওপর কঠোর সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কোনো একক ব্যক্তি নিজ নামে মধ্যমগতির ৩টির বেশি অথবা ধীরগতির ৫টির বেশি রিকশার মালিক হতে পারবেন না। তবে কোনো নিবন্ধিত পরিবহন কোম্পানি হলে তারা সর্বোচ্চ ২৫টি মধ্যমগতির রিকশা কিনতে পারবে।
নতুন নীতিমালায় রিকশার গতির সীমাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। মধ্যম ও স্বল্পগতির ব্যাটারি রিকশা কোনোভাবেই মূল মহাসড়কে উঠতে পারবে না। তবে পাশে যদি সার্ভিস লেন থাকে, সেখানে চলতে পারবে। মধ্যমগতির ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার। আর ধীরগতির ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার। পাশাপাশি এই রিকশাগুলোকে নিয়মিত ফিটনেস সনদ নিতে হবে এবং ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদ রাখতে হবে।
এক বছরের আল্টিমেটাম
এখন প্রশ্ন হতে পারে, বর্তমানে রাস্তায় যে লাখ লাখ অননুমোদনহীন রিকশা চলছে, সেগুলোর কী হবে? সরকার তাদের সরাসরি বাদ না দিয়ে একটা সুযোগ দিচ্ছে। নীতিমালা চালুর পর থেকে ঠিক ১ বছর সময় পাওয়া যাবে। এই এক বছরের মধ্যে বিদ্যমান অনিরাপদ রিকশাগুলোকে নিজ দায়িত্বে অনুমোদিত নিরাপদ মডেলে রূপান্তর করে নিতে হবে। এক বছর পার হলে অবৈধ রিকশার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা বা ক্র্যাকডাউন শুরু হবে।
যে কেউ এখন আর গ্যারেজে রিকশা বানাতে পারবে না। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই বিআরটিএ ও বিডাতে নিবন্ধিত হতে হবে এবং রিকশার ব্যাটারি, মোটর, ব্রেক এবং চার্জারসহ যাবতীয় যন্ত্রাংশ বিএসটিআই অনুমোদিত হতে হবে। আর অনিয়ম করলে? সরাসরি ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে নতুন নীতিমালায়।
কেন এত কড়াকড়ি?
অনেকে বলতে পারেন, এত কড়াকড়ি কেন? বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন—ব্যাটারি রিকশা আমাদের দেশে কোটি মানুষের সাশ্রয়ী বাহন এবং লাখ লাখ পরিবারের জীবিকার উৎস। হুট করে বন্ধ করে দিলে যেমন সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে, তেমনি চালকরাও বেকার হয়ে যান। তাই বন্ধ না করে শৃঙ্খলায় আনাই হচ্ছে সবচেয়ে টেকসই সমাধান। এর ফলে একদিকে যেমন দুর্ঘটনা কমবে, তেমনি জোনভিত্তিক রঙ থাকায় ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। আর সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করায় জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপের বদলে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের এ সিদ্ধান্তে সড়কে বিশৃঙ্খলা কতটা কমে।