গত ৯ আগস্ট দেশের ইতিহাসে সব রেকর্ড ভেঙে লোডশেডিং ছাড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। প্রচণ্ড গরমে গ্রামের পর গ্রাম অন্ধকার, চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন। তবে এই তীব্র সংকটের মাঝেও রাত ১২টা বাজলেই এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে। যেখানে মধ্যরাতে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ ব্যবহার কমার কথা ১ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট, সেখানে গ্রিডের ওপর হঠাৎ তৈরি হয় এক বিশাল অদৃশ্য চাপ।
কোথায় যাচ্ছে এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ? অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ প্রতিদিন গ্রাস করছে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা বা অটোরিকশা—যা স্থানীয়ভাবে ‘টেসলা’ নামেও পরিচিত। মূল মিটার বাইপাস করে অবৈধ লাইনে চার্জ দেওয়ার কারণে এই খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ কীভাবে গায়েব হচ্ছে?
যেভাবে হচ্ছে বিদ্যুৎ চুরি
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মফস্বল ও অলিতে-গলিতে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা চললেও, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতার সুযোগে এসব বাহনের সংখ্যা রাতারাতি বৃদ্ধি পায় এবং একপর্যায়ে ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কগুলোতেও উঠে আসে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মতে, দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, এই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই চলছে প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা।
এসব অটোরিকশার একেকটিতে থাকে ৪ থেকে ৬টি ১২-ভোল্টের ব্যাটারি, যেগুলো চার্জ দিতে ১ ঘণ্টায় প্রয়োজন হয় প্রায় ১ হাজার ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ। অর্থাৎ, ৮ ঘণ্টা চার্জে থাকলে একেকটি রিকশায় খরচ হয় প্রায় ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ।
সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে শুধু এই রিকশা চার্জ করার পেছনে। কিন্তু বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে অনিয়ন্ত্রিত সংযোগ নেওয়ার কারণে এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের কোনো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। শুধু রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলেই এভাবে অবৈধভাবে চার্জ দেওয়া অটোরিকশার সংখ্যা কয়েক হাজার।
২১ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম
অবৈধ সংযোগের কারণে সরকার একদিকে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে এই খাতের পেছনের অবৈধ লেনদেনের আকার দাঁড়িয়েছে বছরে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকায়। সিপিডির তথ্যমতে, রাজধানীজুড়ে থাকা ২০ লাখ অটোরিকশার প্রতিটি থেকে গ্যারেজ ভাড়া ও চার্জ বাবদ দিনে গড়ে আদায় করা হয় ১০০ টাকা। এতে কেবল ঢাকাতেই দিনে লেনদেন হয় ২০ কোটি টাকা, যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকায়। সেই হিসাবে পুরো দেশে গ্যারেজকেন্দ্রিক এই অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ বছরে ২১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, রোড পারমিটবিহীন এসব রিকশায় অবৈধভাবে চার্জ দেওয়ার এই প্রক্রিয়া মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর ধরে কীভাবে চলছে? অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর মূলে রয়েছে অবৈধ লাইনম্যান ও স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। রিকশাগুলো অবৈধ হওয়ায় চালকদের ঘাটে ঘাটে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়, যা ওই সিন্ডিকেটের জন্য এক বিশাল আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অবৈধ হলেও চালকেরা চাঁদা দিয়েই সড়কে গাড়ি চালাচ্ছেন। ঘাটে ঘাটে বিশাল এক অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। তাই এই খাত নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে অত্যন্ত কৌশলী হতে হবে।’
কর্মসংস্থান বনাম দুর্ঘটনার ঝুঁকি
এই অটোরিকশা খাত এখন দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান কর্মসংস্থানের আশ্রয়। তৈরি পোশাক খাত বা অন্যান্য পেশায় চাকরি হারানো মানুষেরা কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই খুব সহজে এখানে যুক্ত হতে পারছেন। প্যাডেল রিকশার চেয়ে এতে শারীরিক শ্রম কম, পরিচালনার খরচ কম এবং দৈনিক আয় প্রায় দ্বিগুণ।
তা ছাড়া মাত্র ৭০ থেকে ৭২ হাজার টাকায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি করা যায়, যেখানে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা কিনতে লাগে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রুত যাতায়াত ও কম ভাড়ার কারণে প্রায় ৮২ শতাংশ যাত্রী এই রিকশাকেই প্রধান বাহন হিসেবে বেছে নেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ চালকের পরিবার এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
তবে মুদ্রার অপর পিঠটি অত্যন্ত ভয়াবহ। বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি এটি সড়ক নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব চালকের প্রায় ৭৫ শতাংশেরই যান চালানোর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। ফলে অটোরিকশার কারণে সড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবে শুধু এক বছরেই অটোরিকশা সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৭৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সমাধানের পথ কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতারাতি এই বাহন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনই সমীচীনও হবে না। কারণ, এর সঙ্গে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের রুটি-রোজি জড়িত। প্রতিদিন সড়ক থেকে কয়েকটি রিকশা জব্দ করে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলবে না। বরং অবৈধ যন্ত্রাংশ আমদানিকারক, রিকশার বডি প্রস্তুতকারক এবং বিদ্যুৎ চুরির সিন্ডিকেটের ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যদি যৌথভাবে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবেই তা ফলপ্রসূ হবে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা সরাসরি অটোরিকশার এসব অবৈধ গ্যারেজে কঠোর অভিযান চালানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।
ব্যাটারিচালিত রিকশা একদিকে যেমন লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস, অন্যদিকে এটি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও সরকারি রাজস্বের জন্য এক বিরাট ক্ষতের কারণ। তাই এই সংকটের সমাধান রিকশা নিষিদ্ধ করা নয়; বরং বিদ্যুৎ চুরির সিন্ডিকেট ভেঙে এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে এনে একে নিয়মে নিয়ে আসাই এখন সময়ের দাবি।
একদিকে বিদ্যুৎ-সংকটে সাধারণ মানুষের হাহাকার, অন্যদিকে অবৈধ সিন্ডিকেটের হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য—সরকার কি পারবে এই ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ ব্যবহারকে নিয়মের মধ্যে আনতে? উত্তরটা সময়ের ওপরই নির্ভর করছে।



