প্যারোল কী, জামিনের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়?

স্বামী তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুতে কারাগারে থাকা সাবেক মন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ডা. দীপু মনিকে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তিনি প্যারোলে মুক্ত থাকবেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে প্যারোল বিষয়টি আসলে কী?

কারাগারে থাকা বন্দিকে সীমিত সময়ের জন্য মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া হলো প্যারোল। বিধি মোতাবেক কেউ প্যারোল আবেদনের যোগ্য হলে তিনি আবেদন করতে পারেন। জামিনের সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। জামিন হয় আদালতের নির্দেশে, কিন্তু প্যারোল হয় প্রশাসনিক আদেশে।

আইনজীবীরা বলছেন, প্যারোল ও জামিনের মধ্যে সুস্পষ্ট চারটি পার্থক্য রয়েছে।

১. আবেদনের শর্ত

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইনজীবী মনজিল মোরশেদ জানান, কেউ যদি মামলার আসামি হয়ে থাকেন বা আসামি হয়ে আটক হয়ে থাকেন তখন তিনি আদালতে জামিনের আবেদন করতে পারবেন।

অন্যদিকে আটক হওয়া আসামি কারাগারে থাকাকালীন বাইরে এমন কিছু যদি ঘটে, যেমন–পরিবারের কারও মৃত্যু, তখন তিনি প্যারোলে মুক্তির জন্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারেন।

২. অনুমোদন

মনজিল মোরশেদ জানান, জামিন হয় আদালতের নির্দেশে, কিন্তু প্যারোল হয় প্রশাসনিক আদেশে।

৩. জিম্মা

জামিন পাওয়া ব্যক্তি বাইরে স্বাধীন থাকবেন। তিনি কোনো আদালত বা পুলিশের জিম্মায় থাকবেন না বলে জানান এই আইনজীবী। অপরদিকে প্যারোল পাওয়া ব্যক্তি পুরো সময় পুলিশের তত্ত্বাবধানে থাকেন।

৪. হাজিরা ও জেল

জামিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তি নির্ধারিত দিনে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী হাজিরা দেন। আর প্যারোল পাওয়া ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময় পর পুলিশ কারাগারে নিয়ে আসবে।

যেকোনো বন্দী প্যারোল পেতে পারে?

আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলছেন, যে কোনো ধরনের বন্দী, কয়েদি বা হাজতিই প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিবেচিত হতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি (কোনো ব্যক্তি) যে অপরাধের কারণে বা যে ধরণ বা মেয়াদের শাস্তি ভোগরতই থাকুন না কেন, সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে (যেমন নিকটাত্মীয়ের জানাজা) তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন প্যারোলে মুক্তির জন্য। মন্ত্রণালয় দূরত্ব ও স্থান বিবেচনা করে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন।’

যে কোনো মেয়াদের বন্দি প্যারোলের সুযোগ পেতে পারে?

মনজিল মোরশেদ বলছেন, সাজা প্রাপ্ত হোক আর না হোক, আটক আছেন এমন যে কেউ এমন আবেদন করতে পারেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

প্যারোলের কোনো নির্দিষ্ট সময় আছে?

একজন আবেদনকারী কত সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি পাবেন-সেটা নির্ভর করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারের ওপর। যেমন–ঢাকা কারাগারে আটক কারও বাবা মারা গেলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তাহলে সেখানে আসা যাওয়া ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে সরকার কত সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেবে তা ঠিক করবে।

আবার তার বাবার জানাজা যদি বায়তুল মোকাররমে হয়, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই সে অনুযায়ী সময় পাবেন বলে জানান আইনজীবী মোরশেদ।

প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে যত নীতিমালা

কোন বন্দি প্যারোল পাবেন এবং প্যারোলের আওতায় তার সময়কাল কীভাবে দেখা হবে-তা নিয়ে একটি নীতিমালা আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। এ নীতিমালা অনুযায়ী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবেন। এ নীতিতে থাকা অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:

১. নিরাপত্তা ও দূরত্ব বিবেচনা করে প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ সময় নির্ধারণ করে দেবেন;

২. নিকট আত্মীয় যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, সন্তান, আপন ভাই-বোন মারা গেলে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যায়;

৩. আদালতের আদেশ বা সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন সাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে;

৪. প্যারোলে মুক্তি পেলেও সার্বক্ষণিক পুলিশ প্রহরায় থাকতে হবে;

৫. কারাগারের ফটক থেকে প্যারোলে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিকে পুলিশ বুঝে নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই কারাগারে ফেরত দিতে হবে।