রংপুরে ৪ হত্যার তদন্ত নিয়ে এত প্রশ্ন উঠছে কেন?

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী এবং মাত্র ১২ বছরের শিশুসন্তান আয়ুশ। একই পরিবারের এই চার জনের নির্মম হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ পুরো দেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সবখানেই এখন একটাই আলোচনা, পুলিশ যা বলছে, তা কি আদৌ সত্যি? কেন বারবার বক্তব্য পাল্টাচ্ছে পুলিশ? কেন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে এত প্রশ্ন, শঙ্কা আর অনাস্থা? চলুন জেনে নেওয়া যাক। 

অসঙ্গতির পাহাড়? 

রংপুর চার খুন মামলার শুরু থেকেই পুলিশের দেওয়া তথ্যে তৈরি হয়েছে অসঙ্গতির পাহাড়। প্রথমত, হত্যার স্থান ও ধরন। ঘটনার পরদিন সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ বলেছিলেন, মা ও মেয়েকে তিনতলার সিঁড়িতে হত্যা করা হয় এবং ১২ বছরের আয়ুশকে হত্যা করা হয় সে যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল তখন। কিন্তু মাত্র চার দিনেই বক্তব্য হঠাৎ বদলে গেল। বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার জানান, মা ও মেয়েকে ছাদে হত্যা করে লাশ সিঁড়িতে এনে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, আর শিশু আয়ুশ ঘুমিয়ে ছিল না, সে ঘুম থেকে উঠে আসামিকে দেখে ফেলায় তাকে হত্যা করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, হত্যার কারণ! প্রথমে বলা হলো ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে এই খুন। এখন বলা হচ্ছে, জমিজমা সংক্রান্ত পুরনো ক্ষোভ ও সামাজিক দূরত্বের কথা। এর ওপর যোগ হয়েছে গ্রেপ্তার আসামি ও তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার হুবহু একই রকম জামা পরা নিয়ে রহস্য। ধর্ষণ নিয়ে ময়না তদন্তকারী ডোমের বক্তব্যও মামলাটি নিয়ে অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।

ক্রেডিট নেওয়ার মানসিকতা?

কিন্তু কেন বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য নিয়ে এই সংশয় তৈরি হয়? অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক সংকট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বিবিসি বাংলাকে জানান, স্পর্শকাতর বা চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অপরাধের আসল রহস্য বা ফরেনসিক রিপোর্ট আসার আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্রেডিট নেওয়ার মানসিকতা থেকে অনুমাননির্ভর বক্তব্য দিয়ে ফেলে।

প্রথমে সংবাদ সম্মেলন করে এক কথা বলা হয়, কিন্তু পরে যখন তদন্ত এগোয়, তখন আগের বক্তব্যের সাথে নতুন তথ্যের মিল থাকে না। ফলাফল? ঘটনার আসল সত্য উদ্ঘাটিত হলেও মানুষের মন থেকে সেই অনাস্থা আর মোছে না। তাছাড়া রংপুরের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার লিখিত বক্তব্য পড়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। এই ধরনের আচরণ মানুষের মনে সন্দেহ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তদন্ত নিয়ে অনাস্থা কি এবারই প্রথম?

তদন্ত নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন বা অনাস্থা তৈরির ঘটনা কি এবারই প্রথম? একদমই নয়। আগেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলা, কুমিল্লার তনু হত্যা, ফেনীর নুসরাত হত্যা কিংবা মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের মতো চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতেও তদন্ত সংস্থার ভূমিকা ও বক্তব্য বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক মারাত্মক সত্য প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক বা ব্রিটিশ আমলে তৈরি আইনে পুলিশকে একটি নিরপেক্ষ তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা হয়নি। তিনি স্পষ্ট বলেন—পুলিশ সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ। ফলে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে নানা আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্র্যাকটিক্যাল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ থাকে। যেখানে এত চাপ, সেখানে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।

অনাস্থার পরিণতি কতটা ভয়াবহ? 

জনগণের এই অনাস্থা ও অবিশ্বাসের পরিণতি ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে পারে? অপরাধবিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন—তদন্তের এই তাড়াহুড়ো আর অনুমাননির্ভর বক্তব্য আমাদের সমগ্র বিচার ব্যবস্থার জন্য এক অন্ধকার অশনি সংকেত। মিরপুরের শিশু রামিসা হত্যার বিচার যদি ১৯ দিনে হতে পারে, তবে হাজার হাজার স্পর্শকাতর মামলায় কেন বছরের পর বছর তদন্ত ঝুলে থাকে? সঠিক সময়ে নিরপেক্ষ ফরেনসিক টেস্ট, ডিএনএ নুমনা সংগ্রহ এবং আসামিদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই না করে শুধু তড়িঘড়ি মামলা শেষ করতে চাইলে আসল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।

যখন সাধারণ মানুষ দেখে যে রক্ষকই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের আইন ও নিরাপত্তার ওপর বিশ্বাস চিরতরে ভেঙে পড়ে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং তাঁর পুরো পরিবারের এই মর্মান্তিক বিদায় কেবল ৪টি লাশের হিসাব নয়। ধ্বংস হয়ে গেছে একটি পুরো পরিবার। মামলার তদন্ত এখন ডিবি পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বস্ত করলেও, মানুষ চায় একটাই জিনিস—কোনো অনুমানের গল্প নয়, চাই নির্ভেজাল সত্য ও নিরপেক্ষ বিচার। তদন্ত সংস্থাগুলো কি পারবে মানুষের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে?