নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ঘটে গেল শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস এক আকস্মিক বিপর্যয়। কয়েক মিনিটের তাণ্ডবে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩২ জনেরও বেশি মানুষ, আর নিখোঁজ অন্তত দেড় হাজার, যার অর্ধেকই বিদেশি পর্যটক। কিন্তু কোনো ঝড় নেই, বৃষ্টিও নেই, তাহলে হুট করে ঠিক কী ঘটেছিল পাহাড়ে? কেন এই দুর্যোগের কোনো পূর্বাভাস মিলল না? চলুন, জেনে নিই নেপালের এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পেছনের বিজ্ঞান।
আকস্মিক এই ধ্বংসলীলা কীভাবে শুরু হলো?
ঘটনার শুরু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচুতে। মহাকাশ সংস্থা প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লেসিওলজিস্ট ড্যান শুগার এবং ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ বিক্রম গুপ্ত এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, পাহাড়ি উপত্যকার ৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচুতে থাকা বিশাল এক হিমবাহের নিচের অংশ প্রচণ্ড গরমে গলে হঠাৎ ভেঙে যায়। আর সেই বরফের চাঁই প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকার মেঝতে এসে আছড়ে পড়ে।
সহজ কথায়, একে বলা হয় আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ, সহজ ভাষায় বললে বরফ, পাথর আর পলি মাটির এক প্রচণ্ড বড় ধস। নেপালের তিব্বত সীমান্তের কাছে এই ধসের কারণে লেন্দে নদীর গতিপথ সম্পূর্ণ আটকে যায়। পাহাড়ের খাঁজে তৈরি হয়ে যায় বিশাল এক কৃত্রিম পানির বাঁধ। কিন্তু প্রকৃতির তৈরি এই অস্থায়ী বাঁধ বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। পানির প্রচণ্ড চাপে সেই বাঁধ ভেঙে যখন ঢল নামল, তখন ভোতেকোশি এবং ত্রিশূলি নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে ৯ মিটার—অর্থাৎ প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত উঁচুতে উঠে যায়।
ভূমিকম্প নাকি অন্য কিছু?
দুর্যোগের ঠিক পরপরই নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, হয়তো কোনো ভূমিকম্পের কারণে এই ভূমিধস হয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসও প্রথমে জানিয়েছিল, সেখানে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু পরে বিজ্ঞানীদের ডেটা বিশ্লেষণ করে মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক তথ্য পেয়েছেন। ইউএসজিএস পরবর্তীতে নিশ্চিত করে—ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়নি, বরং পাহাড়ের সেই বিশাল বরফ ও পাথরের চাঁই ভেঙে নিচে পড়ার ধাক্কাতেই ৪.৪ মাত্রার ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছিল।
কাঠমান্ডুভিত্তিক সংস্থা আইসিআইএমওডির স্যাটেলাইট তথ্যও নিশ্চিত করেছে, এই ধস পুরোপুরি নেপাল অংশেই ঘটেছে। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো—ঘটনার ঠিক আগে সেখানে কোনো বৃষ্টিই হয়নি। টেক্সাস ইউনিভার্সিটির জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফের ভাষায়, ‘এটি এমন এক ঘটনা, যা বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক বন্যা সতর্কসংকেত ব্যবস্থাকে এক নিমিষে ব্যর্থ করে দিয়েছে।’
বেঁচে ফেরার অসম্ভব লড়াই
আচ্ছা, এই পানির ঢল এত বেশি প্রাণঘাতী হলো কেন? মানুষ কি দৌড়ে পালাতে পেরেছিল? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ঢল মোটেও স্বাভাবিক পানি ছিল না। পাহাড়ের হাজার হাজার টন মাটি, পাথর আর বরফ ধসে পানির সাথে মিশে এমন এক কাদা তৈরি করেছিল, যার ঘনত্ব ঠিক তরল কংক্রিটের মতো। একবার ভাবুন, তরল কংক্রিট যখন ১০০ কিলোমিটার বেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসবে, তখন হেঁটে বা দৌড়ে তো দূরের কথা—গাড়িতে চেপেও পালানো অসম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সমতল বা রাস্তায় দৌড়ানো মানে নিশ্চিত মৃত্যু। বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ের অন্তত ২০ ফুট ওপরে দৌড়ে উঠে যাওয়া। কিন্তু নদীর সংকীর্ণ উপত্যকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের সেই সুযোগটুকুও প্রকৃতি দেয়নি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফল?
এখন প্রশ্ন হলো, এই বিপর্যয়ের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের হাত কতটা? জাতিসংঘের ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে গত ৩০ বছরে নেপালের হিমালয় অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ গলে শেষ হয়ে গেছে। আর ভারত ও চীনের মতো দুটি বড় কার্বন নির্গমনকারী দেশের মাঝখানে পড়ে নেপালের হিমবাহগুলো গত দশকে আগের চেয়ে ৬৫ শতাংশ দ্রুতগতিতে গলছে।
গবেষকেরা বলছেন, বিপর্যয়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে তীব্র তাপমাত্রা ছিল। অতিরিক্ত গরমে বরফ দ্রুত গলে নিচের স্থায়ী পারমাফ্রস্ট আলগা হয়ে যায়, যার ফলে হিমবাহের একটা বিশাল অংশ ধসে পড়ে। হিমালয়ের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট এবং এই ধরনের আইস-অ্যাভালাঞ্চের ঝুঁকি এখন শতগুণ বেড়ে গেছে।
আরও বড় বিপদের শঙ্কা!
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, আতঙ্ক কিন্তু এখনই শেষ হচ্ছে না। পরিবেশবিদ চিয়াংগং ঝাং-এর মতে, নদীর উজানে এখনো পাহাড় ও পলির বাঁধ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। যেকোনো মুহূর্তে তৈরি হতে পারে দ্বিতীয় কোনো ভয়াল ঢল। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিজ্ঞানীরা এখন এই ঘটনার ওপর অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি চালাচ্ছেন, এতে দেখা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ঠিক কতটা দায়ী ছিল এই ১৬০টির বেশি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পেছনে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ আমাদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, হিমালয় আর শান্ত নেই। পৃথিবীর ছাদ খ্যাত এই পর্বতমালা গরম হচ্ছে, আর তার মাশুল গুনতে হচ্ছে নিরপরাধ মানুষকে।



