মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান মিলে তৈরি করেছে ন্যাটোর আদলে সামরিক জোট। এর হিসাব হলো, যেকোনো একটি দেশে হামলা হলে, তা বাকি সব কটি দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু আসল চমক কোনটি জানেন? এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি আসলেই মক্কা প্যাক্টে যোগ দেবে? আর যদি দেয়, তবে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব কী পড়তে পারে? আজ সহজ ভাষায় পুরো হিসাব-নিকাশ বোঝার চেষ্টা করব।
কেন বাংলাদেশকে চায় সৌদি?
কথা শুরুর আগেই চলুন জেনে নিই এই মক্কা প্যাক্ট আসলে কী। চলতি মাসেই সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে তিন মুসলিম দেশের মধ্যে চুক্তিটি সই হয়। এই জোটের বিশেষত্ব হলো: এই জোটে আছে তুরস্ক, যার আছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী সেনাবাহিনী। এ ছাড়া আছে পাকিস্তান, যারা কিনা মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। জোটের তৃতীয় সদস্য হলো বিশ্বের শীর্ষ খনিজ তেল রফতানিকারক ও প্রভাবশালী অর্থনীতির দেশ সৌদি আরব। মধ্যপ্রাচ্যে যখন ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলা-পাল্টা হামলায় ভয়াবহ উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, ঠিক সেই সময়ে এই তিন দেশের জোট বেশ গুরুত্ব বহন করছে।
তুরস্কের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছে, এই সামরিক জোট শুধু তিন দেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি সম্প্রসারণ করা হবে। আর সেই সূত্র ধরেই আমন্ত্রণ পৌঁছেছে ঢাকায়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই জোটে অংশগ্রহণের জন্য বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেন, ‘মক্কা প্যাক্ট হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটা ব্যবস্থা এবং এটা আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং এটা নিয়ে কারও, অন্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই। মক্কা প্যাক্ট ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ। তবে এ নিয়ে আলোচনা করার সময় এখনো আসেনি।’
বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি বনাম সুযোগ
বাংলাদেশ সাধারণত বহুজাতিক সামরিক জোট এড়িয়ে চলে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথাই হলো—সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়। তাহলে এই জোটে যোগ দেওয়ার চিন্তা কেন আসছে?
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক কাজ করেন, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস বা রেমিট্যান্স। এ ছাড়া সৌদির সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দ্বিতীয়ত, মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সাথে নিরাপত্তার বিষয়ে এত বড় একটি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাংলাদেশ সহজে ফেলে দিতে পারছে না। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটাও কিন্তু বেশ জটিল।
কূটনৈতিক জটিলতার শঙ্কা
এখন আসা যাক সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়ে—ভারত সংযোগ। ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। বাংলাদেশ তাঁকে ফেরত চাইলেও বিষয়টি নিয়ে এখনো দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সরকার গঠনের ৬ মাস পরেও সম্পর্কের বরফ পুরোপুরি গলেনি। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি এমন কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয় যেখানে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়, তবে নয়াদিল্লি যে তা খুব একটা ভালো চোখে দেখবে না—তা বলাই বাহুল্য।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জানিয়েছে, তারা এই জোটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, তাদের একেবারে নাকের ডগায় বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান বা অন্যান্য দেশের সাথে সামরিক ব্লকে যায়, তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। শুধু ভারতই নয়; আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইরান, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রভাবশালী দেশ ও সংস্থাগুলোর সাথেও বাংলাদেশের বিশাল অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আমরা তৈরি পোশাক রফতানি করি মূলত আমেরিকা ও ইউরোপে। কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকে ভিড়ে গেলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
বিষয়টি নিয়ে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া রয়টার্সকে বলছেন, মক্কা প্যাক্টে যোগ দিলে বাংলাদেশের সম্পর্ক সব দেশের সাথে রাতারাতি ভেঙে যাবে না ঠিকই, তবে বাংলাদেশ কোন পক্ষে আছে—এই কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান মনে করেন, এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ অখুশি হতে পারে, যা খুব স্বাভাবিক। তবে শুধু কোনো দেশ অখুশি হবে কি হবে না—তার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের নিজের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাই হওয়া উচিত মূল প্রাধান্য।
মক্কা প্যাক্ট নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এক বিশাল বড় পরীক্ষা। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করার সুযোগ, আর অন্যদিকে দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং ভারতের মতো প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক সামলানো। বাংলাদেশ কি এই সামরিক জোটে চূড়ান্তভাবে সই করবে, নাকি পর্যবেক্ষক হিসেবে কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখবে?—সেটাই এখন দেখার বিষয়।



