২৬ আগস্টের আকস্মিক বন্যার পর উদ্ধারকাজে নেপালি উদ্ধারকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে চেয়ে কাঠমান্ডুকে প্রস্তাব দিয়েছিল ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ। কিন্তু কাঠমান্ডু সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট দক্ষতা নেপালের উদ্ধারকারী বাহিনীর রয়েছে এবং এক্ষেত্রে বিদেশি কোনো উদ্ধারকারী দলের সহযোগিতার প্রয়োজন নেই।
এদিকে এই প্রস্তাব নাকচ করার ১২ ঘণ্টা পর নেপাল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। কাঠমান্ডু জানিয়েছে, নেপালের কিছু বিশেষ এলাকায় বিদেশি উদ্ধারকারী টিম ও বিশেষজ্ঞদের কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে।
এদিকে এপি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নেপালে নিখোঁজ ১ হাজার ৯২৪ জনের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ছিল—ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ৩২০ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, এদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি।
যে কারণে বিদেশি বাহিনীকে উদ্ধারকাজে অনুমতি দিতে চায়নি নেপাল
১. নিজেদের সক্ষমতার ওপর আস্থা
নেপাল সরকার বলেছিল, দেশটির সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাই উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে সক্ষম। তাই অতিরিক্ত বিদেশি উদ্ধারকারী দলের প্রয়োজন নেই।
২. উদ্ধারকাজে সমন্বয়ের জটিলতা
২০১৫ সালের ভূমিকম্পের সময় বিপুলসংখ্যক বিদেশি উদ্ধারকারী দল আসায় সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়েছিল—এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে নেপাল উদ্ধার অভিযান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. চীন-তিব্বত সীমান্তের সংবেদনশীলতা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সীমান্তের কৌশলগত সংবেদনশীলতার কথা উঠেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলা চীনের তিব্বত সীমান্তে। সাবেক নেপালি কূটনীতিক দিনেশ ভট্টরাই মনে করেন, এই ভৌগোলিক সংবেদনশীলতা বিদেশি বাহিনী প্রবেশে নেপালের অনীহার পেছনে থাকতে পারে। তবে নেপাল সরকার স্পষ্টভাবে বলেছে, চীনের সংবেদনশীলতার কারণে নয়, নিজেদের উদ্ধারকারী বাহিনী যথেষ্ট বলেই তারা প্রথমে বিদেশি দল প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফিন্যানসিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল নিজস্ব সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশকে কাজে লাগিয়ে হেলিকপ্টার ও স্থলপথে হাজার হাজার মানুষকে উদ্ধার করেছে। সর্বশেষ হিসাবে ৩ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষ উদ্ধার হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়া, আহতদের হাসপাতালে পাঠানো এবং ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা নেপালের রয়েছে।
কিন্তু এবারের বন্যায় সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীরাই অনেক এলাকায় পৌঁছাতে পারছেন না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দ্বিতীয় দফা বন্যার ঝুঁকি, পাহাড়ি ভূমিধস, কাদা-পাথরের স্তূপ এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতি। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত টানেল রেসকিউ, ভারী সরঞ্জাম, ড্রোন, উন্নত অনুসন্ধান প্রযুক্তি ও অতিরিক্ত হেলিকপ্টারের প্রয়োজন হয়।
এখানেই নেপালের সক্ষমতা বনাম সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল সাধারণ দুর্যোগে নিজের বাহিনী দিয়ে কার্যকর উদ্ধার চালাতে পারে। কিন্তু এবারের মতো হাজার হাজার নিখোঁজ, শত শত বিদেশি নাগরিক, ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক-সেতু এবং একাধিক দুর্গম উদ্ধারস্থল থাকলে আন্তর্জাতিক বিশেষায়িত দল উদ্ধারকাজকে অনেক দ্রুত করতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের মতো দেশের এনডিআরএফের উচ্চ-উচ্চতা উদ্ধার, টানেল উদ্ধার ও বিশেষায়িত সরঞ্জাম নেপালের জন্য সহায়ক হতে পারে। ভারত ইতোমধ্যে ত্রাণ পাঠিয়েছে এবং প্রয়োজন হলে বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভয়াবহ এই বন্যা নেপালের উদ্ধার সক্ষমতার পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট করে দিয়েছে। নিজস্ব বাহিনী দিয়ে হাজারো মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও দুর্গম ভূপ্রকৃতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও বিপুলসংখ্যক নিখোঁজের কারণে আন্তর্জাতিক বিশেষায়িত সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই শুরুতে বিদেশি বাহিনীকে অনুমতি না দিলেও শেষ পর্যন্ত সীমিত পরিসরে তাদের সহযোগিতা নিতে হয়েছে।