নেপাল-তিব্বত সীমান্তে গত বুধবার সকালে যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে, তার নেপথ্যে একটি হিমবাহের আকস্মিক ধসকেই প্রাথমিকভাবে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন আর শুধু ‘কী ঘটেছিল’ নয়—বরং ‘সামনে কী অপেক্ষা করছে।’ হিমালয়ের বরফ যে গতিতে গলছে এবং পাহাড় যেভাবে ভাঙছে, তাতে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা—এমন দুর্যোগ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর, ক্রমবর্ধমান প্রবণতার সূচনামাত্র।
যা ঘটেছিল বুধবার সকালে
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে বিশালাকার বরফ ও পাথরের একটি ধস নামে। এর জেরে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ত্রিশূলি (ভোটেকোশি নামেও পরিচিত) নদীর তীর ভাসিয়ে দেয়। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, সেতু ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ভেসে যায়; অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং জাইরোং সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্রের অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) বিশ্লেষণ বলছে, মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে ত্রিশূলি নদীর পানি সাত থেকে নয় মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং বেশ কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ স্টেশন ভেসে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবাহের প্রভাব ভারত সীমান্তের কাছাকাছি, প্রায় ১০০ কিলোমিটার নিম্নাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছায় এবং নদীর গতিপথ পর্যন্ত পাল্টে দেয়।
উদ্ধার তৎপরতা যত এগিয়েছে, হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা তত পরিবর্তিত হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। নেপাল সরকার জানায়, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন নেপালে।
দুর্যোগের প্রথমদিকে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভূমিকম্পের ফলে ভূমিধস এবং তা থেকে বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালও বুধবার সংসদে জানান, প্রাথমিক তথ্যে ভূমিকম্পের ইঙ্গিত মিলেছিল।
তবে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) পরে বিষয়টি স্পষ্ট করে জানায়—৪.৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন রেকর্ড হলেও, বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে এই কম্পন আসলে ভূমিকম্প থেকে নয়, বরং একটি হিমবাহ ধসে পড়া এবং তার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই তৈরি হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে সেখানে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি বলেও জানায় সংস্থাটি। ধসে পড়া হিমবাহটি উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার অভিঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার তীব্রতা হিসেবে রেকর্ড হয়।

হিমবাহটি ঠিক কীভাবে ধসে পড়ল
ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডির হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুকের দল নেপালের লাংটাং লিরুং চূড়ার কাছে—বন্যাস্থল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে—একটি হিমবাহের নিম্নাংশ ধসে পড়ার প্রমাণ পেয়েছে। তাঁর ধারণা, হিমবাহটি প্রথমে উত্তর-পশ্চিম দিকে ধসে পড়ে, এরপর নদীর প্রবাহ ধরে পশ্চিম দিকে এগিয়ে যায়।
কানাডার ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-প্রকৃতিবিদ ড্যানিয়েল শুগার স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানান, প্রায় ০.২ বর্গ কিলোমিটার আকারের একটি বরফখণ্ড প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে ভেঙে পড়ে এবং প্রায় ১২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ে। তিনি আরও লক্ষ করেন, দুর্যোগের ২৪ ঘণ্টা আগে ওই এলাকায় প্রচুর বরফ গলে গিয়েছিল—আগের দিন বরফে ঢাকা কিছু অংশ পরদিনই সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল, যা পরিবেশ অস্বাভাবিক রকম উষ্ণ থাকার ইঙ্গিত দেয়। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণও এতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
আইসিআইএমওডি-এর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে ঘটনাস্থলে ‘বরফ ও পাথরের যৌথ ধস’ হয়ে থাকতে পারে, যার ফলে প্রচুর বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ ভোটেকোশি নদীর উপনদী লেনদে খোলায় প্রবেশ করে এবং হঠাৎ পানি, পলি ও পাথরখণ্ডের তীব্র স্রোত তৈরি হয়। সংস্থাটির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল জানান, গত ১৪ মাসে এই একই নদীতে এটি দ্বিতীয়বার বন্যার ঘটনা—যা নিজেই একটি সতর্কসংকেত।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাইক সিয়ার্লের মতে, ভূমিধস থেকে বন্যা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতে কয়েক ঘণ্টা বা দিনও লেগে থাকতে পারে। তাঁর ব্যাখ্যা, ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢেউ ইঙ্গিত দেয় যে প্রথমে একটি ভূমিধস হয়, তারপর পানি জমে নদী সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে যায় এবং শেষে তা হঠাৎ ফেটে বিশাল বন্যায় রূপ নেয়। লাংটাং লিরুং উচ্চ হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত এবং এর দুই পাশে খাড়া উপত্যকা থাকায় পানি আরও দ্রুতগতিতে নিচে নেমে আসার সুযোগ পায় বলেও তিনি মনে করেন।
মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহবিদ অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাকিনটোশ অবশ্য বলছেন, ধসটি শুধু হিমবাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি হিমবাহসহ পাহাড়ের একাংশই ভেঙে পড়েছিল—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর ভাষায়, এত বড় আকারের হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি তৈরি হয়, যা পরে পলি ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে মিশে আয়তনে বেড়ে বন্যায় রূপ নেয়। একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দলও জানিয়েছে, হিমবাহ ধস এই দুর্যোগে নিশ্চিতভাবে জড়িত থাকলেও এটিই একমাত্র কারণ নাও হতে পারে।
দুটি শক্তির মিলন: কেন এই ধস এত ভয়াবহ হলো
অধ্যাপক সিয়ার্লের মতে, হিমালয়ের অন্য অংশের মতো লাংটাং লিরুংও টেকটোনিক প্লেটের দীর্ঘমেয়াদি সচলতার কারণে ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে উঠছে—অনেকটা জ্যাক দিয়ে গাড়ি তোলার মতো। পাহাড় যত উঁচু হয়, হিমবাহও তত খাড়া হয়ে ওঠে এবং তার কিছু অংশ খসে পড়া স্বাভাবিক ঘটনা। সাধারণত এসব ধস ছোট আকারের হয়, যা নদীকে সাময়িকভাবে আটকে দিলেও সহজে ভেসে যায়। কিন্তু বুধবারের ঘটনায় মনে হচ্ছে হিমবাহটি একযোগে ধসে পড়েছে, যা সিয়ার্লের মতে অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই দুর্যোগ সম্ভবত দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার সম্মিলিত ফল—একদিকে টেকটোনিক সচলতার কারণে পাহাড়ের ক্রমশ উঁচু হয়ে ওঠা, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়া। আর এখানেই বিজ্ঞানীদের মূল উদ্বেগ—এই দুটি শক্তি যেহেতু স্থায়ী এবং ক্রমাগত সক্রিয়, তাই তাদের মিথস্ক্রিয়াও থামছে না। সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের ডিন বেঞ্জামিন হর্টন এই ঘটনাকে একটি ‘যৌথ বা জটিল ঘটনা’র উদাহরণ বলছেন, যেখানে ভূকম্পনজনিত সচলতা জলবায়ু-চালিত পরিবর্তনের (হিমবাহ ক্ষয়, পারমাফ্রস্ট গলন, ঢালের অস্থিতিশীলতা) সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে একক কোনো কারণের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ধারাবাহিক ঝুঁকি সঠিকভাবে বোঝা ছাড়া উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের সহনশীলতা বাড়ানো সম্ভব নয়।

আইসিআইএমওডি-এর জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ফারুক আজমের বিশ্বাস, অতিরিক্ত বরফ গলা এবং ভূকম্পনজনিত সচলতার যৌথ প্রভাবই সম্ভবত প্রাথমিক পাথর-বরফের ধসটি ঘটিয়েছিল। তিনি বলছেন, ক্রায়োস্ফিয়ার বা পৃথিবীর বরফাবৃত অংশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত দ্রুত।
সামনে কী অপেক্ষা করছে—বিজ্ঞানীদের মূল উদ্বেগ
বুধবারের ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ এখনো চলছে, তবে বিজ্ঞানীরা প্রায় সবাই একমত একটি বিষয়ে—এই দুর্যোগ বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়। আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ প্রোগ্রামের প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্সের ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তন এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে যা উচ্চ-পার্বত্য অঞ্চলের পাথর ও বরফকে ক্রমশ অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং এ কারণেই এই সপ্তাহে যেভাবে একের পর এক ধস ও বিপর্যয় ঘটেছে, তা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে খাড়া ঢালে বরফের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, গলিত পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং তুষারপাত-বরফগলন-বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসার মতো বিষয়গুলো পাহাড়ের ঢালকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলছে বলে জানান তিনি—অর্থাৎ যে প্রক্রিয়া বুধবারের দুর্যোগ ঘটিয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়া এখনো সক্রিয়।
মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাকিনটোশ বলছেন, হিমবাহবিদ হিসেবে অতীত অভিজ্ঞতার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এই ধরনের ঘটনা দেখে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা এখনো খুব কম নথিভুক্ত হয়েছে বলে হিমবাহ ধস ও জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন—যদিও হিমবাহ গলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেকটাই নিশ্চিত। পারমাফ্রস্টকে তিনি একধরনের ‘আঠা’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা খাড়া ঢালে পাথর ও হিমবাহকে একসঙ্গে ধরে রাখে—আর এই আঠা যত দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তত বেশি ধস ও বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ড. কুকের ভাষায়, ‘সহজ হিসাব হলো—উষ্ণ গ্রহে হিমবাহ সংকুচিত হবে এবং প্রচুর বরফ গলবে। পাহাড়ি অঞ্চলকে যে পারমাফ্রস্ট আংশিকভাবে ধরে রাখে, তা-ও উষ্ণ হচ্ছে, গলছে ও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে আরও বেশি ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ, হিমবাহ-গলা পানি, হ্রদ বিস্ফোরণ ও হিমবাহ ধসের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের; কারণ জলবায়ু উষ্ণতা শেষ পর্যন্ত এই উচ্চ পাহাড়ি পরিবেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেয়।’ অর্থাৎ বুধবারের ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি নতুন স্বাভাবিকতার সূচনা হতে পারে বলেই আশঙ্কা তাঁদের।
পরিসংখ্যান যা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়
দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানও এই আশঙ্কাকে সমর্থন করছে। জাতিসংঘ ২০২৩ সালে জানিয়েছিল, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নেপালের বরফাবৃত পর্বতগুলো মাত্র ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে তাদের বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে, আর ২০১১-২০২০ সময়ে হিন্দু কুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত গতিতে গলেছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত আইসিআইএমওডি-র আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০ সালের পর থেকে এই অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। নেপাল, ভারত, চীন, ভুটান ও পাকিস্তান জুড়ে বিস্তৃত হিমালয় অঞ্চল বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুততায় উষ্ণ হচ্ছে—যার সরাসরি অর্থ, আগামী দিনে হিমবাহ ধস, ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি কমার বদলে বরং বাড়বে।

বারবার ঘটার প্রবণতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনাপ্রবাহ দেখলেই এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের চামোলি উপত্যকায় একটি বিশাল হিমবাহখণ্ড ধসে পড়ে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজের ঘটনা ঘটায়—বিজ্ঞানীদের হিসাবে যার শক্তি ছিল প্রায় ১৫টি পারমাণবিক বোমার সমান। এরপর ২০২৩ সালে সিকিমে, ২০২৪ সালে নেপালের শেরপা গ্রাম থামেতে এবং ২০২৫ সালে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জাইরোংয়ে অনুরূপ দুর্যোগ ঘটে। ড. কুকের মতে, ভারত, সুইজারল্যান্ড ও ইতালিতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিমবাহ ধসজনিত বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা দেখা গেছে। প্রতিটি ঘটনার ব্যবধান ক্রমশ কমে আসাটাই বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে বড় সতর্কসংকেত।
নতুন এক আতঙ্কের নাম ‘গ্লোফ’
বিজ্ঞানীদের কাছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি নাম হলো হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা ‘গ্লোফ’। হিমবাহ গলে প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে যেসব হ্রদ তৈরি হয়, তার প্রাচীর ভেঙে গেলে আকস্মিক ও বিধ্বংসী বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব দ্য সানশাইন কোস্টের হিমবাহবিদ অ্যাড্রিয়ান ম্যাককালামের ভাষায়, ‘জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ সংকুচিত হয়, বরফ পানিতে পরিণত হয় এবং সেই পানি আটকে থাকে’—আর এই আটকে থাকা পানিই একদিন আকস্মিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
জাতিসংঘের হিসাবে, নেপালে এখন দুই হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ২১টিকে ইতিমধ্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—অর্থাৎ ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্যোগের ঝুঁকি এখনো বহু জায়গায় ওঁৎ পেতে আছে। বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যে এ ধরনের বন্যায় ১২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
শেষ কথা
বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট, টেকটোনিক প্লেটের চিরায়ত সচলতা আর জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চাপ যখন একসঙ্গে যুক্ত হয়, তখন হিমালয়ের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের ভারসাম্য দিন দিন নাজুক হয়ে পড়ে। নেপাল-তিব্বতের এই দুর্যোগ তাই কোনো বিচ্ছিন্ন অঘটন নয়—বরং একটি অঞ্চল কীভাবে ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে, তার সবশেষ প্রমাণ।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, দুই হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ দ্রুতগতিতে গলতে থাকা বরফ এবং অবিরাম সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট—এই তিনের সমন্বয়ে হিমালয় এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটা আর ‘যদি’ নয়, বরং ‘কখন’ এবং ‘কোথায়’ পরবর্তী দুর্যোগ ঘটবে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, রয়টার্স



