আসছে নতুন ৫ ডিজিটাল ব্যাংক, কারা পাবেন সুবিধা?

বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে ৫টি ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংক আসলে কী? কেনই বা নতুন করে এতগুলো ডিজিটাল ব্যাংক? আর সাধারণ ব্যাংকের সঙ্গে এর পার্থক্যই বা কোথায়? চলুন, সহজ করে জেনে নেওয়া যাক।

নতুন ডিজিটাল ব্যাংক
নতুন করে প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া ডিজিটাল ব্যাংকগুলো হলো—বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক, ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান এবং কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক। বিকাশের শেয়ারধারীরা বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা। নোভা ডিজিটাল ব্যাংকের সঙ্গে আছে বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপ। বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা। ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটানের উদ্যোক্তা ভুটানের ডিকে ব্যাংক। আর কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা এসিআই, স্কয়ার ও ট্রান্সকমসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

ব্যাংকগুলো কি এখনই চালু হবে?
প্রশ্ন হলো, ব্যাংকগুলো কি এখনই চালু হবে? না। চূড়ান্ত লাইসেন্স এখনো দেওয়া হয়নি। তাই এখনই তারা ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করতে পারবে না।

প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের লেটার অব ইনটেন্ট বা এলওআই দেবে। সহজ করে বললে, এটা হলো ব্যাংক চালুর জন্য প্রাথমিক অনুমতি। তবে এই অনুমতি পেলেই ব্যাংক চালু করা যাবে না। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। শর্তগুলো পূরণ করতে পারলেই মিলবে চূড়ান্ত লাইসেন্স।

৩০০ কোটি টাকা মূলধন
সবচেয়ে বড় শর্তগুলোর একটি হলো মূলধন। প্রতিটি ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের অন্তত ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন দিতে হবে। অর্থাৎ শুধু টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না। মূলধন বাস্তবে পরিশোধ করতে হবে। আগে এই সীমা ছিল ১২৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়।

ছয় মাসের পরীক্ষা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চূড়ান্ত লাইসেন্স শুরুতেই মিলবে না। প্রথমে ব্যাংককে ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে সেবা চালাতে হবে। এই সময়ে তাদের কার্যক্রম কেমন হয়, তা দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সফল হলে চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার পথ খুলবে।

ডিজিটাল ব্যাংকের শুরু কবে?
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরের জুনে আবেদন চাওয়া হলে ৫২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালে আবার আবেদন নেওয়া হয়। তখন ১৩টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। দুই দফা আবেদন থেকে সব মিলিয়ে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হলো।

ডিজিটাল ব্যাংক আসলে কেমন?
নামেই এর উত্তর আছে। এখানে ব্যাংকের কাজ হবে মূলত অনলাইনে। থাকবে না সাধারণ ব্যাংকের মতো শাখার বিশাল নেটওয়ার্ক। অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা জমা রাখা, লেনদেন, বিল দেওয়া কিংবা ঋণের আবেদন—এসব কাজ করা যাবে মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। অর্থাৎ ব্যাংকে যেতে হবে না। বলা ভালো— ব্যাংকটাই যাবে আপনার মোবাইলে!

এটা কি বিকাশ বা নগদের মতো?
এক কথায় বললে, পুরোপুরি বিকাশ বা নগদের মতো নয়। বিকাশ, নগদ বা রকেট হলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস। ডিজিটাল ব্যাংক হবে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক। তবে এর সেবার বড় অংশ থাকবে ডিজিটাল মাধ্যমে। এতে ভার্চ্যুয়াল কার্ড, কিউআর কোডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সুবিধা থাকবে।

কারা বেশি সুবিধা পাবেন?
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক মানুষের জন্য ডিজিটাল ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এসব ব্যাংক কুটির শিল্প, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণ দিতে পারবে। ঋণ দেওয়ার সময় এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ঠিক করা হতে পারে—কারা ঋণ পাবেন। এ ক্ষেত্রে কারও আয়, লেনদেনসহ বিভিন্ন তথ্য কম্পিউটার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে অনেকের জন্য জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এর একটি ঝুঁকিও আছে। যাঁদের আর্থিক লেনদেনের তথ্য কম, বা যাঁদের তথ্য ঠিকভাবে ডিজিটাল ব্যবস্থায় নেই, তাঁরা এআইয়ের এই মূল্যায়নে পিছিয়ে পড়তে পারেন। তবে ডিজিটাল ব্যাংক বড় বা মাঝারি শিল্পে ঋণ দিতে পারবে না। এতে ঋণপত্র বা এলসি খোলার সুযোগও থাকবে না।

ডিজিটাল ব্যাংকের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকিং সেবা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে এমন মানুষদের কাছে, যাঁদের কাছে প্রচলিত ব্যাংকের শাখা পৌঁছানো কঠিন বা ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষায়, ডিজিটাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের বিকল্প নয়। বরং এটি হবে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিপূরক। আর এভাবেই বাংলাদেশে ব্যাংকিংয়ের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার পথে।