রিজার্ভ কীভাবে বাড়ে-কমে, জমা থাকে কার কাছে? 

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৯:২৭ পিএম

সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গণমাধ্যমে অর্থনৈতিক, এমনকি রাজনৈতিক আলোচনাতেও রিজার্ভ শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। এই রিজার্ভ মূলত কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে থাকা ডলার, ইউরোসহ বিদেশি মুদ্রা এবং সোনা, রুপার মতো সম্পদের সমষ্টি।

কেন দরকার? বাংলাদেশের বাজারে কেনাকাটার জন্য টাকা ব্যবহার হয়। কিন্তু আমদানি-রপ্তানির মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য টাকায় হয় না। হয় ডলার, ইউরোসহ বিভিন্ন মুদ্রায়। তেমনি বিদেশি ঋণ, রেমিট্যান্সও আসে বিভিন্ন মুদ্রায়। তবে, বিশ্বব্যাপী মার্কিন ডলারের প্রভাব থাকায় বিদেশি মুদ্রা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডলারে রূপান্তরিত হয়। দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য রক্ষায় রিজার্ভ ব্যবহৃত হয়।

কীভাবে রিজার্ভ তৈরি হয়?

  • পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, তা রিজার্ভে যুক্ত হয়।
  • বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স রিজার্ভ বাড়াতে সাহায্য করে।
  • অন্যান্য উৎসের মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে অর্জিত অর্থ, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান।
  • এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করেও রিজার্ভ বাড়াতে বা কমাতে পারে।

কোথায়–কীভাবে থাকে রিজার্ভ?

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটা অংশই ডলার হার্ড কারেন্সি হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত থাকে। পাউন্ড, ইউরোর মতো আন্তর্জাতিক মুদ্রাতেও রাখা হয় একটা অংশ। সেইসঙ্গে চীনা ইউয়ান, ভারতীয় রুপি, রাশিয়ান রুবলের মতো মুদ্রাও কিছুটা থাকে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা আছে রিজার্ভের অংশ। যেখান থেকে সুইফট কোড হ্যাকিং করে ২০১৬ সালে ১০ কোটি ডলার চুরি হয়। এছাড়া রিজার্ভের অর্থে কেনা আছে স্বর্ণ।

বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের ইতিহাস

একসময় বেশিরভাগ দেশে স্বর্ণকে আদর্শ সম্পদ হিসেবে মজুত করত। কেননা অর্থনৈতিক মহামন্দার সময়েও স্বর্ণ তার মান ধরে রাখতে পারত। ১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের ব্রেটন উডস শহরে এক সম্মেলনে, আন্তর্জাতিক বাজারের মুদ্রাগুলোকে স্বর্ণ অথবা মার্কিন ডলারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। সেসময় বিশ্বের সমস্ত স্বর্ণের অর্ধেকই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে।

কিন্তু ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মার্কিন ডলার থেকে স্বর্ণ সম্পদ রূপান্তরের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেন। এর ফলে, মার্কিন ডলার সম্পূর্ণভাবে একটি ফিয়াট কারেন্সিতে পরিণত হয়, যার মূল্য দেশটির সরকারের নীতির ওপর নির্ভরশীল। এটাকে ‘নিক্সন শক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তখন থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে ডলারের আধিপত্য এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এরপর থেকে বৈদেশিক মুদ্রা মজুতে মার্কিন ডলারই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেভাবে শুরু

স্বাধীনতার পর একরকম শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তেমন কোনো বৈদেশিক মুদ্রার মজুতই ছিল না। প্রায় এক দশক বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কোনো তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় না। সেসময় রপ্তানি বলতে ছিল পাট, চাসহ হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য। অন্যদিকে আমদানি করতে হতো খাদ্য, ওষুধ, রাসায়নিক, শিল্পকাঁচামাল। প্রবাসী আয়ও তেমন ছিল না। স্বাধীনতার এক দশক পর ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল মাত্র ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার।

রিজার্ভ কীভাবে বাড়ে-কমে?

পণ্য বা সেবা রপ্তানি, প্রবাসীদের পাঠানো আয়, বিদেশি ঋণ-অনুদান এবং বিদেশে থাকা বিনিয়োগ থেকে অর্জিত অর্থ দেশে বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়, ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ, বিদেশে বিনিয়োগ রিজার্ভ খরচের মাধ্যম। বাংলাদেশে নানারকম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মাসিক আমদানি কমানো হলেও এখনো তা রপ্তানি আয়ের চেয়ে বেশি। তবে, গত অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে ২৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠিয়েছেন ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ। প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধির ধারা এখনো চলমান, যা বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

রিজার্ভ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ

বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় গত জুলাই মাসে দর ১১৯ টাকা ৫০ পয়সায় নামে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনা শুরু করে। এতে কয়েক দিনের মধ্যে প্রতি ডলারের দাম ১২২ টাকায় উঠে স্থিতিশীল হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, ডলার দর কমলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এজন্য গত সাড়ে তিন মাসে প্রায় ২১৩ কোটি ডলার বাজার থেকে কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের কয়েকটি মাইলফলক

২০০৮ সালের জুন মাসে রিজার্ভ ছিল ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু তারপরই ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ৩ বছরে বড় অঙ্কের রিজার্ভ কমার পেছনে সে সময়কার সরকার বিশ্ববাজারে সার, জ্বালানি তেল, গ্যাসের দামবৃদ্ধিকে দায়ী করে। নীতিনির্ধারকরা বলেন, অতিরিক্ত দামে এসব পণ্য কিনতে ক্ষয় হয় রিজার্ভের শক্তি। কিন্তু বিভিন্ন মহল বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের জন্য ব্যাপক অর্থপাচারের বিষয় সামনে তুলে ধরেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ২৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নামে রিজার্ভ। ২০২৫ সালের অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।

কী পরিমাণ বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ নিরাপদ?

অর্থনীতিবিদরা বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আমদানি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার অন্যতম সূচক। এটা অর্থনীতির শক্তি বিশ্ব পরিমণ্ডলে জানান দেয়। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজার্ভ ধরে রাখতে তৎপর থাকে সব দেশের সরকার। যেমন বাংলাদেশের রিজার্ভ যখন দ্রুত কমছিল তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চেষ্টা করেছিল। আইএমএফ ২০২৩ সালে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে। অন্য দাতাগোষ্ঠীও বাজেট সহায়তা ও বিভিন্ন খাতে ঋণ দিয়েছে, যা রিজার্ভের পতন ঠেকাতে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের এখন গ্রস রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু দ্রুত ব্যবহারযোগ্য বা আইএমএফ হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলারের মতো। যা দিয়ে দেশের সাড়ে ৪ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। সাধারণত ৩ মাসের ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত।

দীর্ঘদিন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির লাভ-ক্ষতি

রিজার্ভ বৃদ্ধি যেমন ইতিবাচক তেমনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত রিজার্ভ দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকলে তা অর্থনীতির মন্থর গতি তুলে ধরে। কেননা প্রবাসী আয়ের বিপরীতে বাজারে যায় স্থানীয় মুদ্রা। অতিরিক্ত রেমিট্যান্সে বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ। আবার পর্যাপ্ত আমদানির অভাবেও রিজার্ভ বাড়তে পারে। এটা ভোক্তার ভোগ ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামালের আমদানি কমে গেলে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ তেমন হলে বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানে টান পড়ে। এতে মানুষের আয় কমতে পারে, যা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর ইঙ্গিত দেয়।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব করেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন। এরপরই জনমনে প্রশ্ন জেগেছে—সত্যিই কি বাতিল হচ্ছে এই দুই বড় নোট? এটি কি সাধারণ...
দিন দিন বাজারে সোনার দাম হয়ে উঠেছে আকাশচুম্বী। তবুও সোনা কেনায় ভাটা পড়েনি এতটুকু। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাহিদা বেড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধাতুটির দাম কেন এত বেশি এবং কেন এত আবেদন?
বাংলাদেশে নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে খরচ। নগদ লেনদেন করতে গিয়ে টাকা ছাপানো থেকে শুরু করে সরবরাহ পর্যন্ত–প্রতিবছর অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। তাই নগদবিহীন...
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও নীতিনির্ধারকেরা জানিয়েছেন, একীভূত হওয়া কোনো ব্যাংকের কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা হবে না। একই সঙ্গে কোনো গ্রাহক তার আমানত হারাবেন না। বর্তমান আইনে শুধু ব্যাংক অবসায়ন হলে...
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর রক্ষা বাঁধের ভাঙন রোধে স্থায়ী সিসি ব্লক বাঁধ নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার ময়নার খামার যুব সংঘ ও স্থানীয় এলাকাবাসীর যৌথ উদ্যোগে...
ইতালির জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ নিয়োগ নিয়ে নাটকীয়তার অবসান ঘটেছে। টানা তিন বিশ্বকাপ খেলতে না পারা দলটার দায়িত্বে দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরছেন রবার্তো মানচিনি। মঙ্গলবার ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের...
রাজধানীর চকবাজারে ব্যাটারিচালিত দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দবির আহমেদ (৫০) নামে এক রিকশাচালক নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে চকবাজার থানার উর্দু রোড মসজিদের সামনে এ দুর্ঘটনা হয়।
নরসিংদীর মাধবদীতে বাড়িতে ঢুকে মো. শাহজাহান (৫৬) নামের এক ব্যক্তিকে খুন ও ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ডাকাত দলের ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মাধবদী থানায় সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান...
লোডিং...

এলাকার খবর