ছাত্র সংসদ মানেই শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর। হলের খাবারের মান বাড়ানো, আবাসন সংকট দূর করা আর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এটাই হওয়ার কথা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর মূল কাজ। কিন্তু ডাকসু নেতারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ না করে যেন হয়ে উঠেছেন একেকজন ঠিকাদার। প্রশ্ন উঠেছে, ডাকসুর ৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের অর্থের উৎস নিয়ে। কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ তুলছে?
প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ
ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির সমর্থিত বর্তমান নেতারা শিক্ষার্থীদের সামনে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান ভালো করা, আবাসন সংকট দূর করা আর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা—এগুলোই ছিল তাদের প্রধান এজেন্ডা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মূল কাজ বাদ দিয়ে তারা এখন ব্যস্ত বড় বড় প্রকল্প নিয়ে।
ডাকসু নেতাদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তারা ফান্ড পেয়েছে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু তারা যে কাজগুলো করেছে, তার বাজেট ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। ভাবা যায়? তারা কী কী করেছে জানেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ও মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন, মেয়েদের জন্য নতুন জিমনেসিয়াম তৈরি, হলের পঠনকক্ষে এসি লাগানো—এমনকি মার্কিন সহায়তায় একটি মসজিদ সংস্কারের মতো বড় বড় কাজও তারা নিজেদের দায়িত্বে করে ফেলেছে।
ভিসি ও প্রশাসনের সাথে দ্বন্দ্ব
সমস্যাটা বাঁধে অন্য জায়গায়। এত বড় বড় কাজ হচ্ছে, অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রশাসন এসবের কিছুই জানেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে খোদ ভিসি ও ট্রেজারার পর্যন্ত পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এসব কাজের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদনই নেওয়া হয়নি। উপাচার্য তো বলেই দিলেন, ডাকসু তাদের আইনি সীমানা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে একটি সমান্তরাল প্রশাসন বা ডুয়েল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চালুর চেষ্টা করছে।
ভিসির সোজা কথা—বাইরে থেকে টাকা এনে কাজ করা হচ্ছে ভালো কথা, কিন্তু সেই টাকার কোনো স্বচ্ছ হিসাব প্রশাসনের কাছে নেই কেন? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে হলের রিডিং রুমে এসি লাগানোর ফলে যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসবে, সেই মেইনটেন্যান্স বা জ্বালানির খরচ কে দেবে? ট্রেজারারও স্পষ্ট জানিয়েছেন, ডাকসুর অ্যাকাউন্টে এই কোটি কোটি টাকার কোনো লিখিত হিসাব জমা পড়েনি।
টাকার খতিয়ান
চারিদিকে যখন এত সমালোচনা, তখন সম্প্রতি ডাকসু ভবন চত্বরে একটি প্রেস কনফারেন্স করে নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন নেতারা। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ দাবি করেছেন, সব কাজ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে এবং অডিট শেষ হলে চূড়ান্ত হিসাব দেওয়া হবে।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী— হলের ছারপোকা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে খরচ হয়েছে ৩২ লাখ টাকা, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নে ৩ কোটি টাকা, কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কারে সাড়ে ৩ কোটি টাকা, মেয়েদের আধুনিক জিমনেসিয়ামে ৬৫ লাখ টাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ হল সংস্কারে তোলা হয়েছে সাড়ে ৭ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে ১৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের খতিয়ান তারা দিয়েছে। নেতাদের দাবি, কিছু স্পন্সর বা দাতা সরাসরি প্রজেক্টগুলো করে দিয়েছে, তাই ক্যাশ হাতবদল হয়নি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রপার অনুমোদন বা টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা এভাবে নিজের ইচ্ছেমতো সংস্কার কাজ করতে পারে কি না?
বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো পরিবর্তন বা সংস্কার করার কোনো সুযোগ নেই। এটি সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল।
এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন ভিন্ন কথা। হলের ক্যান্টিনের খাবারে এখনও তেলাপোকা পাওয়ার অভিযোগ আসছে, লাইব্রেরি ও ক্লাসরুমের সাধারণ সংকটগুলোরও কোনো সুরাহা হয়নি। রাত হলে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে এখনো ছাত্রীরা আতঙ্কে থাকেন। অথচ ছাত্র সংসদের নজর বড় বড় দালানকোঠা আর প্রজেক্টের দিকে।
ডাকসুর কাজ কি তবে এখন আর শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় নয়, বরং ঠিকাদারি বা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হয়ে দাঁড়াল? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। দেখার বিষয়, এই কোটি কোটি টাকার অনুদান আর অনিয়মের পাহাড় শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে।