দক্ষিণ এশিয়ার আকাশের ৯০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলো। আগামী কয়েক বছরে ভারত বিশ্ব এভিয়েশনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে সামনে আসছে। সামনের ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলো তাদের বহরে ৯০০টিরও বেশি উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতিবেশী দেশটি যখন আকাশ দখলে মরিয়া, তখন বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সগুলো এখনো ভারতেরগুলোর তুলনায় অনেক ছোট। ভারতের এয়ারলাইন্সগুলোর কাছে আছে ৭০০টি উড়োজাহাজ। আর চারটি বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সের সম্মিলিত উড়োজাহাজ সংখ্যা অর্ধশত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় এয়ারলাইন্স বিমানের বহরে উড়োজাহাজ আছে ২১টি। সম্প্রতি আরও ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সাথে একটি সমঝোতা হয়েছে।
বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে ইউএস বাংলা এ বছর তাদের বহরে যুক্ত করছে নতুন চারটি উড়োজাহাজ। প্রতিবছর ৪ থেকে ৫টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার লক্ষ্য তাদের। বাকি দুটি এয়ারলাইন্স নভো ও এয়ার অ্যাস্ট্রা মূলত আভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে।
গত জুনে ফ্রান্সের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এভিয়েশন বাজারের অন্যতম বৃহৎ প্রদর্শনী প্যারিস এয়ার শোতে ভারতের উচ্চাকাঙ্খারই প্রতিফলন দেখা যায়। এই এয়ার শোতে এয়ারবাসের এ ৩২০ মডেলের ৫০০টি ন্যারোবডি উড়োজাহাজ কেনার ক্রয়াদেশ দিয়েছে ভারতের বাজেট এয়ারলাইন্স ইন্ডিগো। ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই উড়োজাহাজগুলো এয়ারলাইন্সটি বুঝে পাবে। মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের একমাত্র সান্ত্বনা গত ফেব্রুয়ারিতে এয়ার ইন্ডিয়ার ১৯০টি ৭৩৭ ম্যাক্স এবং ৩০টি দীর্ঘপাল্লার সুপরিসর উড়োজাহাজ কিনতে চাওয়া।
বোয়িং এতে হতাশ হলেও প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক বিপণন বিভাগের প্রধান ডারেন হলি অবশ্য তা প্রকাশ করেননি। প্যারিসের এই ক্রয়াদেশ এটাই প্রমাণ করছে যে, কোভিডের পর আকাশপথে অতিদ্রুত ব্যস্ততা বৃদ্ধির সাথে মানিয়ে নিতেই এয়ারলাইন্সগুলোর বহর সম্প্রসারণের এই তাড়াহুড়ো। ডারেন হলি জানাচ্ছেন, গত বছরের ফার্নবরো এয়ার শোর পর শেষ ১০ মাসে বোয়িং ১১০০টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ পেয়েছে এবং ২০৪২ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য প্রয়োজন হবে ৪২ হাজার ৬০০ নতুন উড়োজাহাজ।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, এয়ারলাইন্সগুলো নতুন উড়োজাহাজের জন্য আওয়াজ তুলেছে। বোয়িং এবং এয়ারবাস মিলিয়ে মোট ১২ হাজার উড়োজাহাজ নির্ধারিত সময়ে ক্রেতাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া কঠিন হতে পারে। এয়ার ইন্ডিয়াও প্রায় ইন্ডিগোর সমপরিমাণ উড়োজাহাজ চায়। এয়ারলাইন্সটি প্যারিস শোতে এয়ারবাসের ২৫০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গত মে মাসে ইউরোপের সর্ববৃহৎ এয়ারলাইন্স রায়ান এয়ার ৩০০টি ৭৩৭ ম্যাক্সের ক্রয়াদেশ দিয়েছিল। গত বছরের শেষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিমানসংস্থা ইউনাইটেড এয়ারও ২০০টি বোয়িং এবং এয়ারবাসের উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেয়।
প্যারিস শোতে রিয়াদ এয়ার একটি আকর্ষণীয় বেগুনি রঙের বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ প্রদর্শন করে। সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের অর্থায়ণে নবীন এই বিমান সংস্থাটি বোয়িংয়ের জনপ্রিয় সুপরিসর মডেলের ৩৯টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দিয়েছে। ২০২৫ সালে এটি আকাশে ডানা মেলতে চায়। রিয়াদভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠান দেশটিকে উন্মুক্ত পর্যটনে নিয়ে যেতে চায়। খুব শিগগিরই এয়ারলাইন্সটি স্বল্প পাল্লার অনেকগুলো উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এত কিছুর পরও কয়েকটি প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রথমত, কোভিডের সময় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া এয়ারবাস ও বোয়িং কি চাহিদা মেটাতে পারবে? মহামারির সময় এয়ারবাস মাসে ৪০টি এ ৩২০ উড়োজাহাজ সরবরাহ করেছে। তারা আশা করছে, ২০২৫ সাল নাগাদ তারা সরবরাহ করবে মাসে ৭৫টি করে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরবরাহ বাড়ানো এতটা সহজ হবে না, যেখানে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান তাদের উচ্চ বেতনের এবং সবচেয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদের ছাটাই করেছে।
আরেকটি প্রশ্ন ভারতকে নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি যতই ধনী হচ্ছে, ততই ফ্লাইট চাহিদা বাড়ছে। বোয়িংয়ের হিসাব অনুযায়ী, আগামী দুই দশকে ভারত হবে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এয়ার ট্রাভেল বাজার। দেশটি এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ৯০ ভাগ এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে। যেখানে চীনের বহর ৪ হাজারের, সেখানে ভারতের বহরে উড়োজাহাজ আছে মাত্র ৭০০টি। এর মধ্যে ইন্ডিগো পরিচালনা করছে ৩০০টি উড়োজাহাজ। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম আভ্যন্তরীণ এই বাজারে আরও ১৩৩০টি উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
ভারতের আভ্যন্তরীণ বাজারের ৬০ শতাংশের নিয়ন্ত্রক ইন্ডিগোকে যদিও দ্রুত বহর সম্প্রসারণের জন্য মূল্য চোকাতে হয়েছে। ইকোনমিস্ট জানায়, গত চার অর্থবছর ধরে এয়ারলাইন্সটি ক্রমাগত লোকসানের মুখে। এয়ারলাইন্সটির বর্তমান সাফল্য অন্য ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যার্থতার সাথে সম্পর্কিত। তাদের এক প্রতিদ্বন্দ্বী জেট এয়ার ২০১৯ সালে দেউলিয়া হয়ে যায়। আরেকটি গো ফার্স্ট উড়ান বন্ধ করেন গত মাসে। তাদের অনুপস্থিতি টিকে থাকা অপারেটররা টিকিটের দাম বাড়ানোর সুযোগ পায়। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি অবশ্যই সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত।
প্রতিযোগিতাতেই নেই দেশি এয়ারলাইন্স
ভারতের এয়ারলাইন্সগুলো যেখানে বৈশ্বিক এভিয়েশন বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হচ্ছে, সেখানে দেশের বাজারের নিয়ন্ত্রণ এখনো দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর হাতে আসেনি। ২০২২-২৩ সালের হিসাবে, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা বছরে প্রায় ৭৮ লাখ। প্রতিবছর এই বাজার ৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দেশে বর্তমানে ৩০টিরও বেশি বিদেশি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা করছে। দেশের এভিয়েশন বাজারের ৭৮ শতাংশই এদের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে রয়েছে এমিরেটস, কাতার এয়ার, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, ওমান এয়ার, এয়ার এশিয়া, মালয়েশিয়ান এয়ার, টার্কিশ এয়ার ইত্যাদি।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাজারের মাত্র ২২ শতাংশের দখল দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর হাতে। অথচ বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এয়ার সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট বা ফ্লাইট চলাচল চুক্তি আছে। অর্থাৎ, এ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরাসরি আকাশপথে যুক্ত হতে পারে। তবে সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না দেশি এয়ারলাইন্সগুলো। বিমান বর্তমানে ১৩টি দেশে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ইউএস-বাংলা করছে ৯টি এবং নভোএয়ার একটি দেশে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট যাত্রী পরিবহন করে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা যাবে না। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) উপদেষ্টা এ টি এম নজরুল ইসলাম ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘আমাদের দেশি অপারেটরগুলো দেশের মধ্যেই সক্ষমতায় অনেক পিছিয়ে। দেশি বাজারে তাদের শেয়ার বাড়াতে হবে। আর এর জন্য নেটওয়ার্কিং বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।’
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে এভিয়েশন খাতের যে প্রবৃদ্ধি সেটি হিসাব করলে আগামী ২০৩০ থেকে ৩৫ সালের মধ্যে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি মধ্যপাল্লার নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়া উচিত। পাশাপাশি যে দেশগুলোর সাথে বিমান চলাচল চুক্তি আছে, সে দেশগুলোতে ফিফথ ফ্রিডম নিতে হবে। তাহলে বিভিন্ন দেশ থেকে যাত্রী এনে তৃতীয় দেশে পরিবহন করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, অন্য এয়ারলাইন্সের সাথে কোড শেয়ারের মাধ্যমে নেটওয়ার্কিং বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করতে হবে।’
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘ঢাকায় আমরা হাব করতে পারছি না কারণ ঢাকাকে কেন্দ্র করে বিমানের খুব বেশি ফ্লাইট নেই। এ ক্ষেত্রে ন্যাশনাল কেরিয়ার বিমানকে নেতৃত্ব দিতে হবে।’
বর্তমানে বিমানের বহরে আছে মোট ২১ টি উড়োজাহাজ। ২০০৮ সালে মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান। চুক্তির সবগুলো উড়োজাহাজই এরই মধ্যে বিমানের বহরে যুক্ত হয়েছে। এর বাইরেও দুটি বোয়িং ৭৮৭ ও কানাডার বোম্বার্ডিয়ারের কাছ থেকে তিনটি ড্যাশ ৮ মডেলের উড়োজাহাজ কিনেছে বিমান। বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা হিসেবে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সমঝোতা হয়েছে। বর্তমানে বিমানের একটি টেকনিক্যাল টিম এই উড়োজাহাজগুলোর যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করছে।
অন্যদিকে, ইউএস বাংলার বহরে উড়োজাহাজ আছে ১৯টি। এ বছর তাদের বহরে আরও চারটি উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সৌদি আরবের জেদ্দা, রিয়াদ ও দাম্মামে এবং কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোয় বাজার সম্প্রসারণ করতে চায়। অন্য দুটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স নভো এয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা মুলত আভ্যন্তরীণ রুটেই ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে। এদের মধ্যে নভোর আছে ৬টি, আর এয়ার অ্যাস্ট্রার আছে ৪ টি এটিআর ৭২ উড়োজাহাজ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের নীতি সহায়তার প্রয়োজন আছে। এ বিষয়ে এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের আভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে যে উড়োজাহাজগুলো চালানো হয়, সেগুলোর সর্বোচ্চ ফ্লাইং আওয়ার ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। কারণ কোনো আভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরেই রাতে বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ওঠানামা করার সুযোগ নেই। এতে এই উড়োজাহাজগুলোর সক্ষমতা অব্যবহৃতই থেকে যাচ্ছে। বেশ কিছু বিমানবন্দর বন্ধ।এগুলো চালু করা উচিত। মানুষের আয় বাড়ছে। ফলে আকাশপথে যাত্রী পরিবহন এখন খুবই সম্ভাবনাময় একটি খাত।’