সৈকতের নির্জন রিসোর্ট কিংবা পাহাড়ঘেরা শহরের অভিজাত ভবন—বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে বিলাসবহুল কোনো অবকাশ যাপন কেন্দ্র। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে চোখ কপালে উঠবে। সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ, হাজার হাজার আইফোন আর ল্যাপটপের পাহাড়।
কম্বোডিয়া বা লাওসে টিকতে না পেরে আন্তর্জাতিক এক অনলাইন প্রতারক চক্র ঠিক কীভাবে বাংলাদেশকে তাদের নিরাপদ আস্তানা বানিয়েছিল? আর কক্সবাজারের মেরিনা বিচ ভিলা বা চট্টগ্রামের খুলশীর বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসে এরা আসলে কীসের ফন্দি আঁটছিল? চলুন, পুরো ঘটনাটা খুব সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।
চট্টগ্রামে ৬৩ বিদেশির গোপন আস্তানা
ঘটনা গত সপ্তাহের। চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত এলাকা খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকা। সেখানকার একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল একদল ভিনদেশি নাগরিক। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে হঠাৎ সেখানে হানা দেয় পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ)। অভিযানে যা পাওয়া গেল, তা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। একে একে আটক করা হলো মোট ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে। এর মধ্যে পাকিস্তানের ২১ জন, লাওসের ৩৫ জন, চীনের ৫ জন এবং একজন করে নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিক ছিলেন। উদ্ধার করা হলো ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ এবং ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র।
সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—এই বিদেশিদের অনেকের কাছেই কোনো পাসপোর্ট ছিল না। এমনকি পাকিস্তানি কয়েকজন ছাড়া বাকিরা কেউ ইংরেজি বা বাংলা কিছুই বোঝেন না, শুধু নিজেদের দেশের ভাষায় কথা বলেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ‘মহসীন’ নামের এক রহস্যময় বাংলাদেশির সহায়তায় জুনের দিকে এরা প্রথমে ঢাকায় আসে এবং পরে চট্টগ্রামে ঘাঁটি গাড়ে। কিন্তু এই মহসীন কে? আর কেনই বা এতগুলো দেশের মানুষ চট্টগ্রামে এসে সাইবার আস্তানা গড়ল? সেই উত্তর খুঁজতেই এখন মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
হিমছড়িতে আইফোনের পাহাড়
চট্টগ্রামের ঘটনা তো কেবল শুরু। এর আগে গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজার শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে রামুর হিমছড়ির ‘মেরিনা বিচ ভিলা’ রিসোর্টেও ঠিক একই কায়দায় হানা দেয় পুলিশ। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ৫ জন চীনা ও ১ জন তাইওয়ানি নাগরিককে। সেখানকার দৃশ্য ছিল আরও ভয়ংকর। পুলিশ প্রথম দফায় প্রায় দুই হাজার, আর দ্বিতীয় দফায় আরও সাতশো—সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৬৮৭টি পুরোনো মডেলের আইফোন উদ্ধার করে। সঙ্গে ছিল ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ এবং চীনা পুলিশের দুটি র্যাংক ব্যাজ ও পতাকা।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ওই রিসোর্টের ভেতরে তৈরি করা হয়েছিল ৬টি বিশেষ সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ, যাতে ভেতরের কোনো শব্দ বাইরে না যায়। পুলিশ জানিয়েছে, ‘বাবর আলী’ নামের এক ব্যক্তি নিজেকে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক পরিচয় দিয়ে এপ্রিল মাস থেকে রিসোর্টটি ভাড়া নিয়েছিলেন। কিন্তু ডিএসবি বা বিশেষ শাখার অনুসন্ধানে এমন কোনো কোম্পানির অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। অভিযানের টের পেয়ে পেছনের সৈকত দিয়ে আরও বহু বিদেশি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশ কেন টার্গেট?
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে—এত শত আইফোন, ল্যাপটপ আর যন্ত্রপাতি নিয়ে এরা আসলে কী করছিল? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্তর্জাতিক চক্রটি মূলত বড় কোনো আর্থিক স্ক্যাম বা বিশাল আকারের সাইবার প্রতারণার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চীন, লাওস বা কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযানের কারণে টিকতে না পেরে, এই অপরাধীরা তুলনামূলক নিরাপদ রুট হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে।
অনলাইন শপিংয়ের নকল সাইট, ফিশিং, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ভুয়া লোগো ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া কিংবা রোমান্স স্ক্যাম বা হানিট্র্যাপের মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক ফাঁদ পাতার নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল এদের। আর এই কাজে তাদের সহায়তা করার জন্য দেশীয় একটি চক্রও পেছন থেকে কাজ করছে। চট্টগ্রাম পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি এই চক্রের বাকি সহযোগীদের ধরতে এখন চিরুনি অভিযান চলছে।
ধরা পড়ল কীভাবে?
পুলিশের সাইবার ইউনিট এখন উদ্ধার করা ল্যাপটপ ও মোবাইলগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা শুরু করেছে। খুলশীর ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করে আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে বিদেশি ভাষা না জানার কারণে দোভাষী নিয়োগ করে তাঁদের রিমান্ডে নিয়ে জেরা করার প্রস্তুতি চলছে।
কক্সবাজারের ঘটনায় রামু থানায় প্রায় আড়াই শ থেকে তিন শ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন খুঁজছে সেই দুই স্থানীয় হোতাকে—চট্টগ্রামের ‘মহসীন’ আর কক্সবাজারের ‘বাবর আলী’কে। এই দুই দেশীয় সহযোগীকে পাকড়াও করতে পারলেই বেরিয়ে আসবে এই আন্তর্জাতিক সাইবার সিন্ডিকেটের পুরো নেটওয়ার্কের ব্লু-প্রিন্ট।
পর্যটন শহর কক্সবাজার বা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম—আজকাল শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধীরাও তাদের নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিচ্ছে। তাই অনলাইনে অপরিচিত কোনো লোভনীয় অফার, ভুয়া ইনভেস্টমেন্ট বা অচেনা লিঙ্কে ক্লিক করার আগে সাবধান হোন। আপনার সামান্য সচেতনতাই পারে আপনাকে বড় ধরনের সাইবার প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে।



