মাছ-মাংসের বাজারে তো পা ফেলার উপায় নেই, তাই বলে কি একটু ডিম খেয়ে বেঁচে থাকার উপায়ও থাকবে না? নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আগুন লাগার পর সাধারণ মানুষ যখন আমিষের উৎস হিসেবে ডিমের ওপর ভরসা করে, ঠিক তখনই হালিপ্রতি ডিমের দাম ঠেকেছে ৫৫ টাকায়। অর্থাৎ এক ডজন ডিম কিনতে গেলে পকেট থেকে গুনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা। যে ডিমকে একসময় বলা হতো গরিবের আমিষ, সেটিও এখন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করে ডিমের বাজারে এই আগুন কেন? এর পেছনের কারণ কি প্রাকৃতিক, নাকি চলছে কোনো অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কারসাজি? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।
রান্নাঘরের কষ্ট
রাজধানীতে এমন অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার আছে, যেগুলো একজন মানুষের আয়ের ওপরই নির্ভরশীল। যে ব্যক্তিটি ৬০০ টাকা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন, তাঁর জন্য সংসার চালানোই যেখানে যুদ্ধ, সেখানে মাছ-মাংসের কথা তো মাথাতেই আনা মানা। রাজধানীর বাজারগুলোতে ফার্মের সাদা ডিম ডজনপ্রতি ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা এবং বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়। আর পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে এক হালি ডিম কিনলেই রাখা হচ্ছে ৫৫ টাকা। সে হিসাবে ডজন পড় পড়ছে ১৬৫ টাকা।
সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, গত এক মাসেই ডিমের দাম বেড়েছে ৩ শতাংশের বেশি। গত দুই মাস ধরে এই উচ্চ দাম বজায় থাকলেও সাধারণ মানুষের কষ্ট লাভে কার্যকর কোনো বড় পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
হোয়াটসঅ্যাপ সিন্ডিকেট
তাহলে প্রশ্ন হলো—হঠাৎ কেন এত দাম বাড়ল ডিমের? খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকাররা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন। কারওয়ান বাজারের এক খুচরা বিক্রেতা তো বলেই ফেললেন, পাইকাররা দুদিন দাম কমালে তিন দিন বাড়ান। কিন্তু আসল রহস্যটা আরও গভীর। দৈনিক সমকালের এক অনুসন্ধান বলছে, ডিমের বাজারের আসল নিয়ন্ত্রণ থাকে ঢাকার বড় ব্যবসায়ীদের হাতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কোন দামে ডিম বিক্রি হবে, সেই রেট নাকি ঠিক করে দেওয়া হয় হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের মাধ্যমে। বড় আড়তদার বা করপোরেট খামারগুলো যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, সারা দেশের ব্যবসায়ীদের সেই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার ওপর ভিত্তি করেই ডিম কেনাবেচা করতে হয়।
এদিকে বিক্রেতারা বলছেন, সবজির দাম বেশি থাকায় মানুষ এখন ডিম বেশি খাচ্ছে, ফলে চাহিদা বাড়ায় দাম বাড়ছে। আবার অনেকে বলছেন, টাঙ্গাইল বা অন্যান্য অঞ্চলের খামার থেকে সরবরাহ কিছুটা কম। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো সাফ জানিয়ে দিয়েছে—এর পেছনে শতভাগ দায়ী কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অতি মুনাফার লোভ।
চট্টগ্রামও পুড়ছে একই আগুনে
পরিস্থিতি শুধু রাজধানী ঢাকায় আটকে নেই। বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ডিমের বাজারে রীতিমতো আগুন লেগেছে। কিছুদিন আগে যে ডিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ডজনে বেড়ে ঠেকেছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায়। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বা আগ্রাবাদের চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাঝে বৃষ্টির কারণে দাম বেড়েছিল। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্য এক বড় কারণ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের ছয় হাজারের বেশি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার মধ্যে ডিম দেওয়া লেয়ার জাতের মুরগির ফার্মও রয়েছে।
ফলে স্থানীয়ভাবে ডিমের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আর এই বন্যার ক্ষতিকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা একেক সময় একেক পণ্য নিয়ে খেলছেন। গরিবের পাত থেকে যারা ডিম কেড়ে নিতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
প্রশাসনের ভূমিকা কী?
এমন পরিস্থিতি কিন্তু এর আগেও দেখা গেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেও ডিমের দাম বেড়ে ডজন ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় উঠেছিল। তখন দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়ে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ডিমের দাম ১১ টাকা ৮৭ পয়সা, অর্থাৎ ডজন ১৪২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর সেই নির্ধারিত দাম এখন মানছে না কেউই। যারা সেবার সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছিল, তারা এখন নতুন করে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তাহলে প্রশাসন কী করছে? জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিদিন বাজার তদারকি করছেন এবং ডিমের বাজারে কোনো কারসাজি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—তদারকি যদি নিয়মিতই চলে, তবে বাজারে তার প্রভাব সাধারণ মানুষ কেন টের পাচ্ছে না? কেন বারবার সিন্ডিকেটের কাছে হেরে যাচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষ?
একটি জাতির পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস হলো এই ডিম। সাধারণ মানুষের পাতে দুটো আমিষের জোগান দিতে যদি সিন্ডিকেট এভাবে থাবা বসায়, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শুধু অভিযান বা লোকদেখানো জরিমানা নয়, এই অসাধু চক্রের শিকড় ফেলতে হবে উপড়ে। কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের এই কান্না থামানো সম্ভব নয়।



