সাংবাদিকমাত্রই কি নির্যাতনযোগ্য?

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত নিপীড়ন, গুম, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। এসব হামলা ও নির্যাতনের কোনো প্রতিকার, এমনকি তদন্ত পর্যন্ত ঠিকমতো হয় না। সাংবাদিকের সাথে হওয়া অপরাধের তদন্ত, বিচার ইত্যাদি না হওয়াই যেন নিয়ম। দেশে বা দেশের বাইরে প্রায় সব ক্ষেত্রে একই চিত্র। এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে যে, সাংবাদিকমাত্রই কি নির্যাতনযোগ্য?

কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। সম্প্রতি জামালপুরের বকশীগঞ্জে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম। গত ৯ জুলাই নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ নায়ারি থেকে দেশটির শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘লা জর্নাডা’-এর সাংবাদিক মার্টিন সানচেজ ইনিগেজের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ইসরায়েলে সংবাদ সংগ্রহের সময় মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় আল-জাজিরার সাংবাদিক শিরিনকে। গত মাসে সাংবাদিক জামোরাকে অর্থপাচারের জন্য ছয় বছরের কারাদণ্ড দেন গুয়েতেমালার আদালত। শুধু তাই না পত্রিকাও বন্ধ করে দেওয়া হলো। এ রকম অসংখ্য উদাহারণ দেওয়া যাবে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণেই ওই হামলা, মামলা, নিপীড়ন। সেটা দেশে হোক, কিংবা দেশের বাইরে।

ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রিপোটার্স উইদাউট বর্ডারসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী ১ হাজার ৬৬৮ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হত্যার শিকার হয়েছেন। সে হিসাবে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০০২-২২ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যা হয়েছে ২০১২ সালে। সে বছর ১৪৪ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হন। সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক নিহত হন সিরিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক ১৫ দেশ
গত দুই দশকে নিহত মিডিয়াকর্মীদের ৮০ শতাংশের মৃত্যু ঘটেছে ১৫টি দেশে। এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দুটি দেশ ইরাক ও সিরিয়া। দেশ দুটিতে গত ২০ বছরে মোট ৫৭৮ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যা বিশ্বব্যাপী মোট নিহতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এর পরই রয়েছে আফগানিস্তান, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিন। আফ্রিকাও রেহাই পায়নি। তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে আছে সোমালিয়া।

প্রতীকী ছবি। ছবি: পেক্সেলইউরোপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ
রাশিয়াকে মিডিয়ার জন্য ইউরোপের সবচেয়ে মারাত্মক দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস।দুই দশকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সাংবাদিক নিহত হয়েছে ইউরোপের ওই দেশে। ভ্লাদিমির পুতিন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে রাশিয়ায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ, নিপীড়ন বেড়ে যায়। এর মধ্যে ২০০৬ সালে পলিতকভস্কায়ার হত্যাকাণ্ড অন্যতম। রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে ইউক্রেনে আট সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। কিন্তু আগের ১৯ বছরে সেখানে মাত্র ১২ জন নিহত হয়। ২০১৫ সালে প্যারিসে ব্যঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক শার্লি হেবদোতে হামলার ঘটনায় ফ্রান্স চতুর্থ মারাত্মক ইউরোপীয় দেশ হিসেবে স্থান পায় ওই প্রতিবেদনে।

গুয়েতেমালায় পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকের জেল ও সংবাদপত্র বন্ধ
উত্তর-পশ্চিমে মেক্সিকো আর পূর্বে হুন্ডুরাস, দক্ষিণ-পূর্বে এল সালভাদর। মধ্য আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল গণতান্ত্রিক দেশ গুয়েতেমালা। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, আর মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ রুটের কারণে প্রায়ই খবরের শিরোনামে হয় দেশটি। রুবেন জামোরা গুয়াতেমালার আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত সাংবাদিক ও দেশটির জনপ্রিয় পত্রিকা ‘এল পিরিওডিকোর’ প্রতিষ্ঠাতা। গত ১৪ জুন তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করেন আদালত। অভিযোগ অর্থপাচার। যদিও জামোরা তো বটেই বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাঁর এ ভোগান্তির পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। এ সম্পর্কিত এক বিশ্লেষণে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, জামোরা প্রায়ই দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহযোগীদের দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করে আসছিলেন। এ জন্য তাঁকে কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি অপহরণও করেছিল একবার। সেবার তাঁকে মারধর ও জোরপূর্বক মাদক সেবন করিয়ে দেশটির রাজধানী গুয়েতেমালা সিটির বাইরে ফেলে যায় তারা। ওই ঘটনার প্রায় দেড় দশক পর এবার আদালতের মাধ্যমে তাঁকে দণ্ড দেওয়া হলো।

অবশ্য আদালতের দেওয়া দণ্ডে কিছুটা হতাশ হতেই পারে দেশটির সরকার। কারণ, হামোরার বিরুদ্ধে মামলায় দেশটির সরকারি কৌঁসুলি (পাবলিক প্রসিকিউটর) আদালতে তাঁর ৪০ বছরের কারাদণ্ডের আবেদন করেছিলেন।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, জামোরাকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে গত ২৫ জুন অনুষ্ঠিত দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডের আগে। এর ঠিক এক মাস আগেই তাঁর ৩০ বছর ধরে বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্বের একটি উদ্বেগজনক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির বিদায়ী প্রেসিডেন্ট আলেজান্দ্রো গিয়ামাত্তেই (তিনি আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না) মামলাটির শুনানিতে প্রভাব বিস্তার করেন। জামোরাকে গত বছরের জুলাইয়ে তাঁর অফিস ও বাড়িতে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেই অভিযান দেশটির জাতীয় মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচারও করা হয়।

গুয়াতেমালার আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও ‘এল পিরিওডিকোর’ প্রতিষ্ঠাতা রুবেন জামোরা। ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়াআর পত্রিকা বন্ধের বিষয়ে গুয়েতেমালা সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এল পিরিওডিকো সংবাদপত্রটি বন্ধের বিষয়ে জামোরার দাবি, কর্তৃপক্ষ বারবার দাতা এবং সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে আসছিল। এ করণে মে মাসে পত্রিকাটি বন্ধ করা হয়। তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলার আলামত ধ্বংসের অভিযোগ তুলেছেন। এমনকি সরকারের হাত থেকে রক্ষা পেতে তাঁর স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে যেতেও বাধ্য হয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন অফিস অন লাতিন আমেরিকার প্রধান ও মার্কিন বুদ্ধিজীবী ক্যারোলিনা জিমেনেজ স্যান্ডোভাল ইকোনমিস্টকে বলেন, জামোরার শাস্তি ‘গণতন্ত্রের জন্য খুব খারাপ সংকেত’। দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ প্রার্থীদের প্রচারকাজে বাধা দেওয়ার জন্য ‘দৃশ্যত ওই স্বেচ্ছাচারী’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইকোনমিস্ট জানায়, গুয়াতেমালার গণতন্ত্র ২০১৯ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট জিম-মাই মোরালেসের শাসনমালে ভঙ্গুর হতে শুরু করে। এই প্রবণতা তাঁর উত্তরসূরি গিয়ামাত্তেই-এর অধীনে আরও বাজে আকার ধারণ করে। এর প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক আইনজীবী ও বিচারক দেশ ছাড়েন। গত নভেম্বর থেকে দুই ডজন সাংবাদিক নির্বাসনে গেছেন।

এটি শুধু গুয়াতেমালার বাস্তবতা নয়। বরং গোটা মধ্য আমেরিকাই এ পথে হাঁটছে। বিশেষত নিকারাগুয়ার ড্যানিয়েল ওর্তেগার পথই এখন এ অঞ্চলের দেশগুলোর সরকারের মডেল হয়ে উঠেছে। গুয়াতেমালায় রাজনৈতিক চর্চা থাকলেও সেখানে মূল নিয়ন্ত্রক সরকার, অভিজাত শ্রেণি ও সেনাবাহিনী। মোটাদাগে দেশটিতে করপোরেট অভিজাততন্ত্রই চলছে, যা একটি কর্তৃত্ববাদী কাঠামো তৈরি করেছে। একই পরিস্থিতি এল-সালভাদরের ক্ষেত্রেও সত্য।

মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যে সাংবাদিকতা সব সময়ই এক কঠিন কাজ। রাজতন্ত্রের অধীনে থাকা দেশগুলোর কোনোটিতেই আদতে সেভাবে মুক্ত সাংবাদিকতার পরিস্থিতি নেই। জামাল খাশোগির কথা কারও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের সৌদি দূতাবাসে যাওয়ার পরই নিখোঁজ হন ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি। সৌদি রাজবংশের ক্ষমতাধরদের কড়া সমালোচনার জন্য আলোচিত ছিলেন সুপরিচিত এই সাংবাদিক।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের সৌদি দূতাবাসে হত্যার শিকার হোন সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি। ছবি: টুইটার থেকে নেওয়া

পুলিশের ধারণা, ৫৯ বছর বয়সী সাংবাদিক খাশোগিকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তার মরদেহ টুকরো করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সৌদি সরকার বরাবরই এ হত্যাকাণ্ডে যুবরাজের সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। ২০১৮ সালেও সৌদির যুবরাজই এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা বলে সিআইএ সন্দেহ করেছিল। তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কখনো বিষয়টি প্রকাশ করেনি। আর এখন তো ওয়াশিংটন পুরোপুরি নীরব। দুই দেশের সম্পর্ক নবায়নের মধ্য দিয়ে খাশোগি হত্যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সোচ্চার অবস্থানেরও বদল হয়েছে।

নারী সাংবাদিক শিরিনকে গুলি করে হত্যা
জামাল খাশোগি হত্যার পর বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে সমালোচনা হয় কাতারভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল-জাজিরার সুপরিচিত সাংবাদিক শিরিন আবু আকলা হত্যাকাণ্ড নিয়ে। ২০২২ সালের মে মাসে ইসরায়েল অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরের জেনিনে খবর সংগ্রহের সময় সাংবাদিক শিরিন আবু আকলাকে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলি বাহিনী।

আল-জাজিরা ওই সময় জানায়, ইসরায়েলি বাহিনী ‘ঠান্ডা মাথায়’ এবং ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ ৫১ বছর বয়সী শিরিন আবু আকলাকে গুলি করে। একই ঘটনায় প্রযোজক আলি সামুদিও গুলিবিদ্ধ হন।যদিও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সাংবাদিকদের টার্গেট করে গুলি চালানোর কথা অস্বীকার করে। উল্টো তাদের ফিলিস্তিনিরা গুলি করেছে বলে দাবি করে ইসরায়েল।

২০২২ সালে পশ্চিমতীরের জেনিনে খবর সংগ্রহের সময় সাংবাদিক শিরিন আবু আকলাকে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলি বাহিনী। ছবি: টুইটারদুই দশকের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন ও সহিংসতার খবর সংগ্রহ করে আসছিলেন শিরীন। এখন পর্যন্ত এর কোনো সুরাহা হয়নি। পশ্চিমারাও এ নিয়ে অনেকটা নীরব।

বাদ নেই উত্তর আমেরিকা
উত্তর আমেরিকায় সাংবাদিক নিপীড়নের দিকে তাকালে প্রথমেই আসবে মেক্সিকোর নাম। নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ নায়ারি থেকে দেশটির শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘লা জর্নাদা’-এর সাংবাদিক মার্টিন সানচেজ ইনিগেজের মরদেহ উদ্ধার করা হয় গত ৯ জুলাই। ৫৯ বছর বয়সী এই সাংবাদিকের মরদেহ হুয়াচিনেস গ্রামে পাওয়া যায়।

তিনি কি সাধারণ কোনো অপরাধের শিকার? আলামত কিন্তু সে কথা বলছে না। মার্টিনের স্ত্রী সিসিলিয়া লোপেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, মার্টিন নিখোঁজের পর আত্মীয় বাড়ি থেকে ফিরে দেখি সানচেজের কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, হার্ড ড্রাইভ ও স্যান্ডেল চুরি হয়ে গেছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগেও লা জর্নাদা পত্রিকার সাংবাদিকেরা হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০১৭ সালে মিরোস্লাভা ব্রিচ নামের এক সাংবাদিককে চিহুয়াহুয়াতে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া চলতি বছরের মে মাসে জাভিয়ের ভালদেজ নামের এক সাংবাদিক সিনালোয়াতে খুন হন। তিনি এএফপির সংবাদদাতা হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন বলেও জানিয়েছে এএফপি।

মেক্সিকোকে সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি বলে মনে করা হয়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) জানিয়েছে, ২০০০ সাল থেকে গত তিন বছরে দেড় শতাধিক সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে মেক্সিকোতে।

এদিকে মেক্সিকো সরকার জানিয়েছে, গত বছর ১৩ জন সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে মেক্সিকোতে। বেশির ভাগ সময় দেশটিতে সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না।

বাংলাদেশের কী অবস্থা
আসা যাক বাংলাদেশের প্রসঙ্গে। দেশে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা ও নিপীড়ন চললেও বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর। হত্যার দু-একটি ঘটনায় ১২ বছরের বেশি সময় পর বিচারিক আদালতে বিচার মিললেও চূড়ান্ত রায় অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘায়িত হয়।

দেশে গত সাড়ে সাত বছরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের

সময় কিংবা অন্যভাবে ৯ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। একই সময়ে শারীরিক নির্যাতন, মামলা, হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন অন্তত ১৪০০ সাংবাদিক। মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। আসকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে ১ জন, ২০১৮ সালে ২ জন, ২০১৯ সালে ১ জন, ২০২০ সালে ১ জন, ২০২১ সালে ১ জন, ২০২২ সালে ১ জন নিহত হন।

সর্বশেষ জামালপুরের বকশীগঞ্জে সন্ত্রাসীদের হামলায় প্রথমে গুরুতর আহত ও পরে নিহত সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিমের কথা শুরুতেই বলা হয়েছে।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি। ছবি ফেসবুকসাংবাদিক হত্যা ও তার বিচার না হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে সামনেই আছে সাগর-রুনি দম্পতি। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে তাঁদের ভাড়া বাসায় খুন করা হয়। এর পর ১২ বছরের বেশি সময় পার হলেও আলোচিত এই হত্যার বিচারের দাবিতে এখনো আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করেন সাংবাদিকেরা। ইতিমধ্যে এ হত্যা মামলার প্রতিবেদন দিতে গত ২২ মে পর্যন্ত ৯৭বারের মতো সময় নিয়েছে তদন্ত সংস্থা র‍্যাব।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ১১৯ জন সাংবাদিক হয়রানি, হুমকি, মামলাসহ বিভিন্নভাবে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি ২৯ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর পর চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় জেলায় ৮ জন করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

বিচার প্রশ্নে সবাই এক কাতারে
.সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতনের ঘটনা গোটা বিশ্বেই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দেশের কথা ধরলে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গত দুই যুগে একজন সাংবাদিকেরও হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়নি; কিংবা অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি।

।এই কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করার জেরে ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিককে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ব্যাপক হেনস্তা হতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের দেওয়া এক হিসাবে দেখা যায়, দেশটিতে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের মধ্যে ৮৩টি ঘটনা ঘটেছে যা, সংবাদমাধ্যমে স্বাধীনতাকে খর্ব করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব অভিযোগ অনেকটা নিয়ম মেনেই অস্বীকার করেছে ভারত সরকার।

দেশে বা দেশের বাইরের খুব বেশি উদাহরণের উল্লেখ ছাড়াই বলে দেওয়া যায় যে, প্রায় সব দেশেই ঘোষিত বা অঘোষিতভাবে সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রেই যেমন সরাসরি হামলা করা না হলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাংবাদিক শুধু নয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে, যার শুরু হয়েছিল সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়। রাষ্ট্রের প্রশাসন, কর্তাব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কার্যকলাপকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া বা সমালোচনা না করার একটা ধারা বিশ্বজুড়েই শুরু হয়েছে বলা যায়। এর অন্যথা হলেই প্রথম আক্রমণটি হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

তারপরও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক না থামলে তাঁকে হয়তো আক্রান্ত হতে হয় শারীরিকভাবে। মোটাদাগে এই হচ্ছে দেশে সাংবাদিকদের বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতাকে আরও বাজে রূপ দিচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সাংবাদিক নিগ্রহ, হত্যা ইত্যাদির কোনো বিচারিক সমাধান কম সময়ের মধ্যে আসছে না বলে নিপীড়কেরা আগের চেয়ে আরও বেশি তৎপর হচ্ছে, যা এ ধরনের ঘটনার শঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলছে।